চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিউমোনিয়ায় ২০ দিনে ২৬ শিশুর মৃত্যু
চট্টগ্রামে গরম শুরুর সঙ্গে বেড়েছে শিশুদের নিউমোনিয়ার প্রকোপ। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এপ্রিল মাসের প্রথম ২০ দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৭৫টি শিশু ভর্তি ছিল। এর মধ্যে নিউমোনিয়া নিয়ে ২৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এসব শিশুর হাম শনাক্ত না হলেও তাদের শরীরে ফুসকুড়ি ছিল।
চিকিৎসকেরা জানান, গরমের শুরুতে নিউমোনিয়ার রোগীর সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তন, ধুলাবালু বৃদ্ধি এবং ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এ ঝুঁকি তৈরি হয়। তা ছাড়া হামে আক্রান্ত রোগীদের নিউমোনিয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। হামের লক্ষণ নিয়ে আসা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) রাখতে হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুস্বাস্থ্য বিভাগে তিন শতাধিক শিশু ভর্তি ছিল। এর মধ্যে নিউমোনিয়া নিয়ে ভর্তি ছিল অন্তত ১০০ শিশু। হামের উপসর্গ ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ১৩ শিশুকে রাখা হয়েছে পিআইসিইউতে। তাদের জ্বরের মাত্রা বেশি হওয়ায় আইসিইউতে তাদের সেবা দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে শিশু বিভাগ।
মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিন হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগে দেখা গেছে, সেখানে একই শয্যায় রেখে দু–তিনটি শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হামের জন্য আলাদা দুটি ব্লকের ১৬ শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছিল ৫০টির বেশি শিশু। অন্তত ৪টি শিশুকে রাখা হয়েছে মেঝেতে শয্যা পেতে। অন্তত ১০ শিশুর নিউমোনিয়ার জটিলতা আছে বলে জানিয়েছেন অভিভাবকেরা।
সেখানে দেখা হয় এক বছর বয়সী নুর মো. সাফওয়ানের সঙ্গে। ১১ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি সে। হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর নিউমোনিয়া দেখা দিলে তাকে তিন দিন পিআইসিইউতে রাখতে হয়। সাফওয়ানের বাবা মোহাম্মদ শফিক বলেন, ১১ দিন আগের ছেলের গায়ের ফুসকুড়ি দেখতে পেয়ে ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখান থেকে চট্টগ্রামে আসেন। এখন আগের চেয়ে ভালো আছে সে।
সাফওয়ানের সঙ্গে একই শয্যায় ছিল এক বছর বয়সী তোফা। এই দুই শিশুই নিউমোনিয়ার জটিলতা নিয়ে হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের ‘হাম ব্লকে’ ভর্তি।
জানতে চাইলে শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ মুছা মিঞা প্রথম আলোকে বলেন, বছরের এই সময়ে নিউমোনিয়ার রোগী বাড়ে। যেসব শিশু মারা গেছে, তাদের হাম শনাক্ত হয়নি। তবে শরীরে র্যাশ (ফুসকুড়ি) ছিল। হামের রোগীদের একসঙ্গে রাখা হয়েছে। স্থান সংকুলান না হওয়ায় বাধ্য হয়ে মাটিতে রাখতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ মার্চ থেকে গতকাল বুধবার সকাল পর্যন্ত জেলায় ৫৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় (গত মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে গতকাল বুধবার সকাল ১০টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন ভর্তি হয়েছে ৩১ জন। নতুন করে শনাক্ত ১২ জন। হাসপাতালে ১৫৭ জন চিকিৎসাধীন। গত এক মাসে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩৪৭ জন।
আক্রান্ত ৫৩ জনের মধ্যে ৩৭ জনের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশের বয়স তিন বছরের কম। তবে আক্রান্তের তালিকায় মতিউর রহমান নামের ৩৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তির নাম পাওয়া গেছে। সিভিল সার্জন কার্যালয় ও সরকারি হাসপাতালগুলোয় খোঁজ নিয়ে ওই ব্যক্তির বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছোটবেলায় হামের টিকা না নিয়ে থাকলে বয়স্ক ব্যক্তিদের হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ওই ব্যক্তি হয়তো আগে টিকা নেননি। এ কারণে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। এ কারণে আমরা হামের টিকার ওপর বেশি জোর দিচ্ছি। ১৫ উপজেলার ৭ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হবে।’