টাঙ্গাইল-৪ আসন
‘মুখে নৌকা, হৃদয়ে ট্রাক’
গতকাল সকালে লতিফ সিদ্দিকী এলেঙ্গা লুৎফর রহমান মতিন মহিলা কলেজে যান। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন এলেঙ্গা পৌরসভার মেয়র নূর এ আলম সিদ্দিকী।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর বহিষ্কৃত সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদার ওরফে ঠান্ডু। স্থানীয় আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ লতিফ সিদ্দিকীর পক্ষে কাজ করছে। আবার অনেকে ‘ওপরে ওপরে নৌকা, ভেতরে–ভেতরে লতিফ সিদ্দিকী’র হয়ে কাজ করছেন।
গত মঙ্গলবার ও গতকাল বুধবার কালিহাতী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এ চিত্রই দেখা গেছে।
গতকাল সকালে লতিফ সিদ্দিকী এলেঙ্গা লুৎফর রহমান মতিন মহিলা কলেজে যান। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন এলেঙ্গা পৌরসভার মেয়র নূর এ আলম সিদ্দিকী। তিনি কলেজের হল রুমে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা, নারীশিক্ষা, নারীজাগরণ বিষয়ে বক্তৃতা করেন। এ সময় কলেজের শিক্ষক–কর্মচারীরাও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বক্তৃতায় ভোট সম্পর্কে কিছুই বলেননি। পরে তিনি উপজেলার বালিআটা, কাজীবাড়ী, কামন্না, রামপুর, বল্লা ও রতনগঞ্জ এলাকায় গণসংযোগ করেন।
গতকাল বিকেলে উপজেলার পটোল বাজারে লতিফ সিদ্দিকীর ট্রাক প্রতীকের সমর্থনে নির্বাচনী সভা হয়। সেখানে পারখী ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের গত কমিটির সহসভাপতি আজিজুর রহমানসহ স্থানীয় অনেক আওয়ামী লীগ নেতা অংশ নেন। এ ছাড়া গত রোববার বিকেলে বল্লা করোনেশন হাইস্কুলে লতিফ সিদ্দিকীর বড় নির্বাচনী সভা হয়। এতে তাঁর ছোট ভাই কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম বক্তব্য দেন। ওই সভামঞ্চেও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল মজিদসহ অনেক নেতাই উপস্থিত ছিলেন।
দলীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও একজন সহসভাপতি—এই তিন সদস্যের কমিটি দিয়ে চলছে উপজেলা আওয়ামী লীগ। অন্য নেতারা বিগত কমিটির পদ–পদবির পরিচয় দিয়ে চলছেন।
এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হাসান ইমাম খান। তিনি এবার মনোনয়ন পাননি। এ আসনে লতিফ সিদ্দিকী ১৯৭০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সাতবার নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। পাঁচবার নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর স্ত্রী লায়লা সিদ্দিকীও ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দলীয় একাধিক নেতা জানান, কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগ লতিফ সিদ্দিকীর হাতে গড়া। তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও নেতা–কর্মীদের মধ্যে তাঁর প্রভাব রয়ে গেছে। এ জন্যই স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ তাঁর পক্ষে কাজ করছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে প্রকাশ্যে লতিফ সিদ্দিকীর পক্ষে কাজ করছেন নৌকা প্রতীক নিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান হওয়া কয়েকজন চেয়ারম্যান।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মোল্লা অনেক নেতা–কর্মী লতিফ সিদ্দিকীর পক্ষে কাজ করছেন স্বীকার করে বলেন, ওই নেতা–কর্মীরা দলের প্রার্থীর পক্ষ থেকে চাপ দিলে তাঁরা উদাহরণ দিচ্ছেন বিভিন্ন আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে অনেক নেতা–কর্মী কাজ করছেন। কোথাও কাউকে বাধা দেওয়া হচ্ছে না।
বিগত কমিটির সহপ্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক শরিফ আহমেদ বলেন, দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা দিয়েছেন যে যাঁর মতো নির্বাচন করতে পারবেন। তাই কালিহাতীর বিভিন্ন এলাকায় দলীয় নেতা–কর্মীরা স্বতন্ত্র প্রার্থীর দিকে ঝুঁকছেন।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি আবদুল মজিদ বলেন, ‘বেশির ভাগ দলীয় লোক ট্রাকের পক্ষে নেমে পড়েছেন। আমি নিজেও আগে নৌকার পক্ষে ছিলাম। এখন ট্রাকের পক্ষে আছি।’
আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মোজহারুল ইসলাম তালুকদার বলেন, যেসব নেতা–কর্মী দলীয় প্রতীকের বিরুদ্ধে কাজ করছেন, তাঁদের সম্পর্কে জেলা নেতাদের জানানো হয়েছে। তাঁরা সতর্ক করা শুরু করেছেন। যাঁরা আওয়ামী লীগ করেন, তাঁদের সবার দায়িত্ব নৌকা প্রতীকের সম্মান রক্ষা করা।
ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী লতিফ সিদ্দিকী বলেন, এ আসনের মানুষ আনন্দচিত্তে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। খুব সুষ্ঠু পরিবেশ, সুন্দর পরিবেশ রয়েছে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা–কর্মী প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে তাঁর পক্ষ নিয়ে কাজ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সবাই উৎসাহের সঙ্গে কাজ করছেন। এ ছাড়া বুকে নৌকার ব্যাচ নিয়ে ঘুরছেন। কিন্তু মনের মধ্যে ট্রাক কিড়কিড় করছে। ‘বুকে নৌকা, মনে ট্রাক—এ রকমও বহু আছে।’
এ আসনে লতিফ সিদ্দিকী ও মোজহারুল ইসলাম ছাড়া আও ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁরা হলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী শাজাহান সিরাজের মেয়ে সারওয়াত সিরাজ (ঈগল প্রতীক), জাতীয় পার্টির মো. লিয়াকত আলী (লাঙ্গল), তৃণমূল বিএনপির শহীদুল ইসলাম (সোনালী আঁশ), বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মো. শুকুর মাহমুদ (একতারা), জাতীয় পার্টির (জেপি) সাদেক সিদ্দিকী (বাইসাইকেল) ও জাকের পার্টি মোনতাজ আলী (গোলাপ ফুল)। এ আসনের মোট ভোটার ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৫৫৬ জন।