স্ত্রী-সন্তানের সুস্থতার আনন্দে চিকিৎসকের জন্য উপহার নিয়ে হাসপাতালে কৃষক
কৃষক জেবর আলী টানা চার বছর স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালের আইসিইউতে দৌড়াদৌড়ি করেছেন। স্ত্রীর চিকিৎসার পেছনে প্রায় সব টাকা ব্যয় করেছেন। ইতিমধ্যে বিরল রোগে আক্রান্ত স্ত্রী জীবন ফিরে পেয়েছেন। চিকিৎসকদের নিষেধাজ্ঞা ছিল সন্তান নিয়ে যাওয়া যাবে না। ভুলক্রমে তা-ও পেয়ে গেছেন। ১০ দিন আগে স্ত্রী-সন্তানকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে গেছেন।
স্ত্রী-সন্তানের সুস্থতায় খুশি হয়ে আজ মঙ্গলবার দুপুরে চিকিৎসকের জন্য উপহারসামগ্রী নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাজির হন জেবর আলী। হাসপাতালের আইসিইউপ্রধান আবু হেনা মোস্তফা কামালের কাছে তিনি বিভিন্ন ফল ও মিষ্টি নিয়ে আসেন।
জেবর আলীর বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিড়ালদহ পলাশবাড়ী গ্রামে। তাঁর স্ত্রী তানিয়া (২৫) ‘মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস’ রোগে ভুগছিলেন। এটি হলো শরীরের একটি বিরল ও দীর্ঘমেয়াদি অটোইমিউন স্নায়বিক রোগ। শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা (ইমিউন সিস্টেম) যখন ভুলবশত স্নায়ু ও পেশির সংযোগস্থলে আক্রমণ করে, তখন এই রোগ হয়। এতে মস্তিষ্ক থেকে আসা সংকেত পেশি পর্যন্ত পৌঁছাতে বাধা পায় এবং পেশিগুলো চরম দুর্বল হয়ে পড়ে। রোগটি পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয়, তবে এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
২০২৩ সালের শুরুতে হঠাৎ চোখের পাতা পড়ে যাওয়া ও তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন তানিয়া। হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানান, তানিয়া মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস নামের অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত। তখন তাঁকে ২১ দিন লাইফ সাপোর্টসহ প্রায় আড়াই মাস হাসপাতালে থাকতে হয়। বর্তমানে তিনি ওই রোগ থেকে সেরে উঠেছেন।
২০২৫ সালের অক্টোবরে স্বামীসহ সেই নারী আইসিইউতে দেখা করতে আসেন। ওই দম্পতি তখন জানান, গাইনি, নিউরো মেডিসিনের চিকিৎসক সবাই তাঁদের বকা দিয়েছেন। কারণ, নিষেধ সত্ত্বেও ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন। অনেকে পরামর্শ দিয়েছেন গর্ভপাত করাতে, কিন্তু তাঁদের পরামর্শ তাঁরা মেনে নিতে পারেননি। পরে আবার তাঁরা আইসিইউপ্রধান আবু হেনা মোস্তফা কামাল শরণাপন্ন হন। ৩ মে তানিয়া কন্যাসন্তানের মা হন। ৯ মে মা-মেয়ে সুস্থ অবস্থায় হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফেরেন।
আজ দুপুরে কৃষক জেবর আলী হাসপাতালে আসেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন ডাব, লিচু, কলা ও চার কেজি মিষ্টি। জেবর আলী বলেন, ‘স্যার (আবু হেনা মোস্তফা কামাল) আমাকে খুব ভালোবাসেন। চার বছর ধরে টানা তাঁর কাছে স্ত্রীর চিকিৎসা করাচ্ছেন। যখন আসেন, তখনই আমাকে দেখা করার সুযোগ দেন। আমার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। আমি স্যারের কাছে ঋণী।’
যোগাযোগ করলে আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, তিনি এসব জিনিস (উপহার) নিয়ে চলে যেতে বলেছেন। তারপরও চার ঘণ্টা ধরে ওই ব্যক্তি হাসপাতালে বসে আছেন।