কক্সবাজারের ৪টি আসনেই বিএনপির জয়, একটিতে ব্যবধান মাত্র দেড় হাজার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজারের চারটি আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে কক্সবাজার–৪ আসনে ১ হাজার ৫৪৯ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বিএনপি প্রার্থী। আজ শুক্রবার ভোরে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান চারটি আসনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেন।
কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া)
এই আসনে বেসরকারিভাবে জয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী ও দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি ৯৫ হাজার ৮৪০ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ২ লাখ ২০ হাজার ৫৬৬। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক পেয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৭২৬।
ফল ঘোষণার পর ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জীবনে অনেক স্ট্রাগল করেছি, আমি অনেক সৌভাগ্যবান। মহান আল্লাহ আমাকে কখনো পরাজয়ের মুখ দেখাননি। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে আমি বিজয়ের বেশে প্রত্যাবর্তন করেছি। এই শুকরিয়া শেষ দিন পর্যন্ত থাকবে।’
স্বাধীনতার পর থেকে এই আসনে আওয়ামী লীগ দুইবার, বিএনপি পাঁচবার, জাতীয় পার্টি তিনবার, জামায়াতে ইসলামী একবার এবং কল্যাণ পার্টির প্রার্থী একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে সালাহউদ্দিন আহমদ দুইবার ও তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমদ একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আসনটিতে এবার জামায়াত প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুকের ব্যাপক প্রচারণা আলাপে এলেও এলাকায় দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তার কারণে বিএনপির প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদ যে জয়ী হবেন, তা অনেকটাই নিশ্চিত ছিলেন ভোটারেরা।
কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া)
এই আসনে বেসরকারিভাবে জয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৬৬০ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর হামিদুর রহমান আযাদ পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৮১৭ ভোট।
মহেশখালী ও কুতুবদিয়া নিয়ে এই আসন গঠিত। হামিদুর রহমানের বাড়ি কুতুবদিয়া এবং আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদের বাড়ি মহেশখালীতে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটিতে হামিদুর রহমান জয়ী হয়েছিলেন। আলমগীর ফরিদও এ আসন থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আলমগীর ফরিদ বলেন, ‘নানা ক্ষেত্রে জেলার দুই সাগরদ্বীপ মহেশখালী-কুতুবদিয়া অবহেলিত। দুই উপজেলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে আমি কাজ করব।’
বিএনপির নেতারা বলেন, এবারের নির্বাচনে আলমগীর ফরিদের জয় নিয়ে স্থানীয় নেতারা উদ্বিগ্ন ছিলেন। কারণ, মহেশখালীতে বিএনপি ছিল দ্বিধাবিভক্ত। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু বক্কর ছিদ্দিকের সঙ্গে আলমগীর ফরিদের বিরোধ দীর্ঘদিনের। নির্বাচনের আগে সালাহউদ্দিন আহমদের হস্তক্ষেপে দুই নেতা এক মঞ্চে আসায় আলমগীর ফরিদের জয় সহজ হয়।
বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, এবারের নির্বাচনে মহেশখালীতে ধানের শীষ পেয়েছে ৯৫ হাজার ২৫৯ ভোট, আর দাঁড়িপাল্লা পেয়েছে ৫৪ হাজার ৫৬৯ ভোট। কুতুবদিয়াতে দাঁড়িপাল্লা পেয়েছে ৩৫ হাজার ২৪৮ ভোট, আর ধানের শীষ পেয়েছে ২৯ হাজার ৪০১।
কক্সবাজার-৩ (সদর, রামু ও ঈদগাঁও)
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী লুৎফুর রহমান কাজল বেসরকারিভাবে জয়ী হয়েছেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবীবিষয়ক সম্পাদক। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর শহিদুল আলম বাহাদুর।
বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, বিএনপির প্রার্থী লুৎফুর রহমান কাজল পেয়েছেন ১ লাখ ৮১ হাজার ৪৬০ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জামায়াতের শহিদুল আলম বাহাদুর দাঁড়িপাল্লায় পেয়েছেন ১ লাখ ৫২ হাজার ৯৯৪ ভোট। ভোটের ব্যবধান ২৮ হাজার ৪৬৬।
বিএনপির প্রার্থী কাজল স্থানীয়ভাবে সজ্জন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। তাই তাঁর জয়ের ব্যাপারে অনেকটাই আশাবাদী ছিল দল। কাজলের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শহিদুল আলম বাহাদুর কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান এবং কক্সবাজার সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। এলাকায় তিনি ‘ভিপি বাহাদুর’ নামে অধিক পরিচিত।
জয়ের পর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে লুৎফুর রহমান কাজল প্রথম আলোকে বলেন, ‘জামায়াত প্রার্থী শহিদুল আলম বাহাদুর টানা এক বছর ধরে ভোটারের সঙ্গে ছিলেন। অনেক পরিশ্রম করেছেন। ফলাফলও অনেক ভালো করেছেন। তাঁকে নিয়েই আমরা মিলেমিশে কক্সবাজারের উন্নয়নে কাজ করতে চাই। ধানের শীষকে বিজয়ী করায় সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’
কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ)
বিএনপির প্রার্থী ও দলের জেলা শাখার সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী বেসরকারিভাবে জয়ী হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৫৮২ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী নুর আহমদ আনোয়ারী। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের এই প্রার্থী পেয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার ৩৩ ভোট। দুজনের ভোটের ব্যবধান ১ হাজার ৫৪৯।
এই আসনটি জেলায় ‘ভাগ্য আসন’ হিসেবে পরিচিত। কারণ, অতীতে এই আসন থেকে যে দলের প্রার্থী জয়লাভ হয়েছেন, তাঁর দলই সরকার গঠন করেছে। এবারও সেটি সত্য হলো। শাহজাহান চৌধুরী এ আসনে চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপও। পঞ্চমবারের মতো তিনি আসনটিতে জয়লাভ করেছেন। প্রথম আলোকে শাহজাহান চৌধুরী বলেন, সব ভেদাভেদ ভুলে তিনি এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে চান।
আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী নুর আহমদ আনোয়ারী টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদে ২০০৩ সাল থেকে টানা ২২ বছর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। হ্নীলার একটি ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে ছিলেন তিনি। আজ শুক্রবার সকালে নুর আহমদ আনোয়ারী নিজের ভ্যারিফায়েড ফেসবুকে উখিয়া-টেকনাফবাসীর উদ্দেশ্যে দেওয়া একটি পোস্ট করেন। এতে লেখেন, ‘আমাকে ৯২৯ ভোটে পরাজিত দেখিয়ে ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এই ফলাফল অনেক অসংগতি রয়েছে। আমরা বিস্তারিত পর্যালোচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব ইনশা আল্লাহ’।