দুই দিন আগেও গাজীপুরের মৌচাকের শালবন ছিল জনমানবশূন্য। গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে সেই চিত্র পাল্টে যায়। প্রায় ১১ হাজার কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থীর কলরবে মুখর হয়ে ওঠে মৌচাকের শালবন।

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক জাতীয় স্কাউট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ‘সাবাস-শক্তির ফোয়ারা’ প্রতিপাদ্যে ৯ দিনব্যাপী ৩২তম এশিয়া প্যাসিফিক আঞ্চলিক স্কাউট ও একাদশ জাতীয় স্কাউট জাম্বুরি-২০২৩ শুরু হয়েছে। প্রায় সাড়ে ৯০০ স্কাউট দল, স্কাউটার, কর্মকর্তা, রোভার ভলান্টিয়ার ও বিভিন্ন দেশ থেকে আগত স্কাউটারদের নিয়ে মোট ১১ হাজার স্কাউট জাম্বুরিতে অংশ নিয়েছে।

জাম্বুরিতে গতকাল ‘বেটার ওয়ার্ল্ড ফ্রেমওয়ার্ক’ প্রোগ্রামের আওতায় বিশেষ এলানে অংশ নেয় স্কাউটরা। সেখানে তারা জানতে পারছে, কীভাবে উন্নত বিশ্ব তৈরি করা যায়। শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ প্রোগ্রামের আওতায় আর্থ ট্রাইব (উপজাতি বা সম্প্রদায়), মেসেঞ্জার অব পিস (শান্তির বার্তা), হি ফর শি (সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী-পুরুষের সমতা), ডায়ালগ ফর পিস (শান্তির আলোচনা) ও স্কাউটস অব দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাওয়ার্ড—পাঁচটি বিষয়ে ধারণা পায় স্কাউটরা।

স্কাউট কর্মকর্তারা জানান, আর্থ ট্রাইবে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে একজন স্কাউট প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাবে। মেসেঞ্জার অব পিসের মাধ্যমে জানতে পারবে একজন স্কাউট অন্য স্কাউটের প্রতি কীভাবে শান্তির বার্তা পৌঁছে দেয়, হি ফর শি কর্মসূচির মাধ্যমে নারী-পুরুষের সমতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা জানবে। আর ডায়ালগ ফর পিসের মাধ্যমে জানবে সামাজিক শান্তির মাধ্যমে কীভাবে ভালো থাকা যায়।

বাংলাদেশ স্কাউটসের জাতীয় উপকমিশনার (প্রশিক্ষণ) আরিফুজ্জামান বলেন, এসব কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে একজন স্কাউট নিজেকে মানবিক মানুষ হিসেবে তৈরি করতে সক্ষম হবে। তাদের মেধা ও শ্রমকে বিকশিত করে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একজন সৎ, যোগ্য, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।

স্কাউট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কিশোর-কিশোরীরা দল বেঁধে সেখানে অবস্থান করছে। নিজের মালপত্র নিজেরাই বহন করে নিজ নিজ তাঁবুতে নিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্যাম্পুরিতে পৌঁছে সবাই সবার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। আর শিক্ষককে কাজ করতে দেখে ছোট ছোট শিক্ষার্থীও কাজে নেমে পড়ছে।

গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সিফাত আদনান বলে, ‘স্কাউট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিবেশটা দেখে মনে হচ্ছে পুরোই আমার নিজের এলাকা। এখানে আমরা যে কয়েক দিন থাকব, একটি পরিবার হয়ে থাকব।’ একই বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী দীপ্ত তালুকদার বলে, ‘স্কাউট সর্বদা ভালো মানুষ হতে শেখায়। আমরাও লেখাপড়া করে ভালো মানুষ হতে চাই।’

স্কাউট লিডার জিনাত রেহেনা বলেন, ‘এখানে আসার আগে কিশোর বয়সী শিক্ষার্থীদের নিয়ে অনেক চিন্তায় ছিলাম। ওরা ঠিকমতো থাকতে পারবে কি না। কিন্তু এখন দেখছি, ওরা নিজেদের কাজ নিজেরাই করছে।’

স্কাউট কর্মকর্তারা জানান, একাদশ জাতীয় স্কাউট জাম্বুরি হচ্ছে স্কাউটদের বৃহত্তম মিলনমেলা। প্রতি চার বছর পর এ আয়োজন করে বাংলাদেশ স্কাউটস। অংশগ্রহণকারী সবাই তাঁবুতে বসবাস করে ক্যাম্পুরির কার্যক্রমে অংশ নেয়। নিজেদের রান্না নিজেদের করেই খেতে হয়। পালা করে এ দায়িত্ব পালন করে স্কাউটরা।

এদিকে জাম্বুরির দ্বিতীয় দিন আজ শনিবার সকাল থেকে অংশগ্রহণকারী স্কাউট দলগুলো তাদের তাঁবুকলাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। তাঁবু ও স্থান নির্ধারণের পর নিজের তাঁবুকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও সুন্দর করার মহাযজ্ঞ শুরু হয়। প্রতিদিন সকালে ধারাবাহিকভাবে তাঁবু পরিদর্শনের অংশ হিসেবে নিজ নিজ তাঁবুকে শৈল্পিক রূপ দিতে চলে শিল্পকর্ম।

পুরো স্কাউট জাম্বুরিকে মোট চারটি ভিলেজে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ভিলেজে দুটি করে মোট আটটি সাব ক্যাম্পে বিভক্ত করা হয়েছে। ৯ দিনব্যাপী এ ক্যাম্পে স্কাউটদের জন্য থাকছে তাঁবুকলা, হাইকিং নাইট ও ইয়ুথ ভয়েজ, ক্যাম্প ফায়ার, খেলা, মেধা যাচাইসহ মোট ২০টি চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জে অংশ নিয়ে স্কাউটরা তাদের মেধা, শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, আধ্যাত্মিক বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশ স্কাউটসের পরিচালক (জনসংযোগ) এ এইচ এম শামসুল আযাদ বলেন, স্কাউটিংয়ের মূল লক্ষ্য একজন শিক্ষার্থীর শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ সাধন করা। এর মাধ্যমে একজন স্কাউট নিজেদের সৎ, যোগ্য ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।