ছয় মাস ধরে এক শিক্ষক দিয়ে চলছে যে স্কুল

জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আছেন মাত্র একজন শিক্ষক। দুই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে পাঠদান করান তিনি। গত বৃহস্পতিবার তোলাছবি: প্রথম আলো

একতলা পাকা ভবনে সাজানো–গোছানো শ্রেণিকক্ষ। সেখানে হাজির হয় শিক্ষার্থীরাও। কিন্তু পাঠদানের জন্য শিক্ষক পাওয়া যায় না। কারণ, শিক্ষকের পাঁচটি পদের একটি ছাড়া সবই শূন্য। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা চলায় ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। যারা আছে, তারাও অনিয়মিত হয়ে পড়ছে।

এমন চিত্র জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি থেকে একজন শিক্ষকই বিদ্যালয়টি চালাচ্ছেন। তিনি আবার প্রধান শিক্ষক হওয়ায় দাপ্তরিক কাজেও তাঁকে সময় দিতে হয়। নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় শিখনঘাটতিতে পড়ছে শিক্ষার্থীরা।

সরকারি এই বিদ্যালয়ে এখন ৭০ শিক্ষার্থী পড়ছে। তাদের মধ্যে প্রাক্-প্রাথমিকে ১৭ জন, প্রথম শ্রেণিতে ১১, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১১, তৃতীয় শ্রেণিতে ১০, চতুর্থ শ্রেণিতে ১০ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ১১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে।

গত বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে কিছু শিক্ষার্থী খেলাধুলা করছে। একটি শ্রেণিকক্ষ থেকে পড়ার শব্দ ভেসে আসছিল। সেখানে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি মিলে মাত্র ১০ জন শিক্ষার্থী হাজির ছিল। তাদের সবাইকে একসঙ্গে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে পড়াচ্ছেন প্রধান শিক্ষক আবদুল মমিন। বিদ্যালয়ের একতলা পাকা ভবনে দুটি শ্রেণিকক্ষ এবং টিনশেড ঘরে দুটি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে।

২০১৮ সাল থেকে এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আবদুল মমিন। তিনি জানান, তাঁর যোগদানের সময় বিদ্যালয়ে আরও তিনজন সহকারী শিক্ষক ছিলেন। পর্যায়ক্রমে তাঁরা অবসরে চলে যান। পরে মৌখিকভাবে একজন শিক্ষক দেওয়া হয়েছিল। চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি তিনিও অবসরে চলে যান। এর পর থেকে তিনি একাই বিদ্যালয়টি সামলাচ্ছেন।

মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মমিন প্রথম আলোকে বলেন, প্রায়ই তাঁকে দাপ্তরিক বিভিন্ন কাজে উপজেলা সদরে যেতে হতো। তবে এখন ক্লাস শেষ করে বিভিন্ন সময়ে দাপ্তরিক কাজ করে থাকেন। শিক্ষক না থাকায় অভিভাবকেরা সন্তানদের এ বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে চান না।
মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করার বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখি করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এরপর ৯ জুলাই সাময়িকভাবে পাশের একটি বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষককে মৌখিকভাবে পাঠদান করতে বলেছে শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়। তবে এখনো কাউকে পদায়ন করা হয়নি বলে শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।

যে গ্রামে এই বিদ্যালয় সেখানকার বাসিন্দা মিন্টু মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, একজন শিক্ষক কীভাবে এতগুলো ক্লাস নেবেন। তারপরও তিনি যেটুকু পারেন, সেটুকু পড়ান। শিক্ষক-সংকটের কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। তাঁরা চান, দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ করা হোক।

অবকাঠামো থাকলেও শিক্ষক না থাকায় ক্রমেই শিক্ষার্থীরা অন্য স্কুলে চলে যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে
ছবি: প্রথম আলো

মাদারগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থান। অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এখানে শিক্ষকেরা আসতে চান না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁরা বলছেন, কাঁচা রাস্তায় চলাচলের জন্য সব সময় যানবাহন পাওয়া যায় না। উপজেলা সদরে যাতায়াতে মোটরসাইকেলই একমাত্র ভরসা। তবে বৃষ্টি হলে কাঁচা রাস্তায় মোটরসাইকেল চালানোও কষ্টকর হয়ে যায়।

ছয়–সাত বছর আগে এই বিদ্যালয়ে প্রায় ১২০ শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষক-সংকটের কারণে কমতে কমতে এখন ৭০ জনে এসেছে। শিক্ষক সংকটের কারণে নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় সামনে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও কমতে পারে এমন আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সবচেয়ে কাছের বিদ্যালয়টিও সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সাদিক ইসলাম, মো. আলামিন ও তামান্না আক্তার কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তারা বলেছে, শিক্ষক না থাকায় ঠিকমতো তাদের ক্লাস হয় না। অনেক সময় তারা নিজেরা ক্লাসে বসে থাকে। আবার একসঙ্গে দুই শ্রেণির ক্লাস হয়। শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা অন্য স্কুলে চলে যাচ্ছে। নতুন শিক্ষক দেওয়া হলে তাদের লেখাপড়া আরও ভালো হতো।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাদারগঞ্জে ২০১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে ১ হাজার ২৩৬ জন শিক্ষকের পদ আছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৮ জন শিক্ষক কর্মরত। বাকি ১৪৮টি পদ শূন্য।

জামালপুরের সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ হওয়ার ফলে সেখানে শিক্ষকেরা যেতে চান না। এ ছাড়া শিক্ষক–সংকটও রয়েছে। তবে ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক-সংকটের বিষয়টি জেনে গত সপ্তাহে একজন শিক্ষককে পাঠদান করতে বলা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ওই বিদ্যালয়ে আরও শিক্ষক পদায়নের ব্যবস্থা করা হবে।