সকাল ৯টা বাজলেও যেন ভোর কাটেনি। রাজশাহী নগর যেন জমে আছে কুয়াশায়। হিমেল বাতাসে ঘরের বাইরে লোকজন কম। এর মধ্যেই নগরের চৌদ্দপাই এলাকায় সকাল থেকেই একদল শ্রমিক কাজ করছেন। কেউ কোদাল দিয়ে শক্ত হয়ে যাওয়া মাটি কুপিয়ে ঢালিতে ভরছেন, কেউ আবার সেটি কাঁধে তুলে দূরে ফেলে দিচ্ছেন।
কাজের ফাঁকে হঠাৎ এক শ্রমিক বলে উঠলেন, ‘এত শীত যে হাতডা এক্কেবারে অবশ হয়ে আসে। ঢালির সঙ্গে আঙুলের ঘষা লাগলে তহনই বোঝা যায়, হাতডা এখনো আছে।’ কথা শেষ না হতেই আবার ঢালি টানতে লাগলেন তিনি।
কয়েকজন শ্রমিক দেয়াল তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আজকের কাজটা যেন শুধু মাটি খোঁড়ার নয়, শীতের সঙ্গে লড়াইয়েরও। আজ মঙ্গলবার রাজশাহীতে বছরের সবচেয়ে শীতল দিন। আবহাওয়া অফিসের হিসাবে আজ এ অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এটি আবার সারা দেশের মধ্যেও সর্বনিম্ন।
তীব্র শীতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে। নগরের তালাইমারী মোড়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই জড়ো হন শতাধিক দিনমজুর। কেউ এসেছেন পাশের গ্রাম থেকে, কেউবা দূরের উপজেলা থেকে। কাজের আশায় দাঁড়িয়ে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কিন্তু শীত যত বাড়ছে, কাজ তত কমছে। আজও দেড় শতাধিক শ্রমিকের ভিড় থাকলেও কাজ পেয়েছেন হাতে গোনা কয়েকজন। সকাল ৯টা পেরোতেই অনেকে কাজ না পেয়ে নীরবে ফিরে যান বাড়ির পথে।
চারঘাট উপজেলার ইউসুফপুর ইউনিয়নের টাঙ্গন এলাকার বাসিন্দা ফিরোজ আলী বলেন, ‘শীত পড়লেই আমাদের কপাল পোড়ে। যারা কাজ দেয়, তারা মনে করে, শীতে আমরা ঠিকমতো কাজ করতে পারব না। তাই ডাকও কম পড়ে। কিন্তু পেট তো আর শীত বোঝে না।’
আজ রাজশাহীতে সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত সূর্যের দেখা মেলেনি। গতকাল সোমবারও সারা দিন সূর্য আড়ালেই ছিল। সকাল পৌনে ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা। যানবাহন চলাচল কম। যাঁরা প্রয়োজনের তাগিদে বাইরে বের হয়েছেন, তাঁদের গায়ে মোটা জামা, সোয়েটার ও জ্যাকেট। কেউ কেউ চাদর দিয়ে পুরো শরীর, এমনকি মুখমণ্ডলও ঢেকে রেখেছেন। সকাল ১০টা পর্যন্ত শহরের অনেক দোকানপাটই খোলেনি।
নগরের কাজলা এলাকায় কথা হয় ব্যাংকার মো. হারুনের সঙ্গে। তিনি রিকশার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি বলেন, শীতের সময় সকালবেলা অটোরিকশা পাওয়া কঠিন। শীত তো সবারই লাগে। গরিব, ধনী মানে না। সকালবেলা একটু ভাড়াও বেশি। এ সময়ে অফিসে যাওয়ায় জন্য সব মানুষ একসঙ্গে বের হন।
রিকশাচালক তৈয়ব আলী বলেন, শীতে হাত শুধু কাঁপে। গায়ে পোশাক পরলেও ভেতর থেকে ঠান্ডা হয়ে আসে। তাই অনেকে সকালবেলা বাড়িতেই থাকে।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি শীতে রাজশাহীতে প্রথম দফার শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছিল গত ৩১ ডিসেম্বর। এরপর টানা চার দিন শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। এর মধ্যে গত শুক্রবার মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পরে গত রোববার তাপমাত্রা বেড়ে ১২ ডিগ্রিতে উঠলে শৈত্যপ্রবাহ কিছুটা কমে যায়। ভোরে কুয়াশার মতো হালকা বৃষ্টি হলেও দুপুরে দেখা মিলেছিল রোদের। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। গতকাল সোমবার আবার তাপমাত্রা নেমে আসে ১০ ডিগ্রিতে। আর আজ এক ধাপে ৩ ডিগ্রি কমে নেমে আসে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
আবহাওয়াবিদদের হিসাবে, কোনো এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ১ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ দশমিক ১ থেকে ৮ ডিগ্রি হলে মাঝারি, ৪ দশমিক ১ থেকে ৬ ডিগ্রি হলে তীব্র এবং ৪ ডিগ্রির নিচে নামলে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ধরা হয়। সেই হিসাবে আজ রাজশাহীতে চলছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ পর্যবেক্ষক রহিদুল ইসলাম বলেন, আজ রাজশাহীতে চলতি বছরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এই শৈত্যপ্রবাহ আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে।