তিন টার্মিনালে সুনসান নীরবতা, বন্ধ জাহাজ চলাচল

কর্মবিরতির কারণে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের চিটাগং কনটেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) কার্যক্রম। আজ দুপুরে তোলাছবি: সৌরভ দাশ

চট্টগ্রাম বন্দরের ৪ নম্বর ফটক। স্বাভাবিক সময়ে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার জাহাজে তোলার জন্য নেওয়া হয় এই ফটক দিয়ে। আবার আমদানি পণ্য বা কনটেইনারও এই ফটক দিয়ে বের করা হয়। এ কারণে সব সময় ফটকের সামনে দেখা যায় পণ্যবাহী যানবাহনের দীর্ঘ সারি। তবে আজ বুধবার ফটকের আশপাশে পণ্য পরিবহনের কোনো গাড়ি দেখা গেল না। ফটকের দুই পাশই বন্ধ। ব্যক্তিগত যানবাহন ঢোকা বা বের হওয়ার সময় ফটকের এক পাশের লোহার দরজা খুলে দেওয়া হচ্ছে।

একই অবস্থা বন্দরের অন্য সব ফটকেও। ফটক পেরিয়ে বন্দরের ভেতরে প্রায় চার কিলোমিটার লম্বা তিনটি টার্মিনাল রয়েছে। পাশের উড়ালসড়কের ওপর থেকে দেখা যায়, তিন টার্মিনালেই সুনসান নীরবতা। কোনো কনটেইনার ওঠানো-নামানো হচ্ছে না। টার্মিনালের জেটিতে থাকা ১১টি জাহাজ ক্রেন গুটিয়ে বসে আছে। গ্যান্ট্রি ক্রেনের বুম (যে অংশ দিয়ে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়) সেগুলোও গুটিয়ে রাখা হয়েছে।

এনসিটি ইজারার প্রতিবাদে ডাকা লাগাতার কর্মবিরতির দ্বিতীয় দিন আজ বুধবার বেলা ১১টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা বন্দর এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখেছেন প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক সৌরভ দাশ। ২০০৭ সাল থেকে গত ১৯ বছরে শ্রমিক-কর্মচারীদের এমন কর্মসূচি দেখা যায়নি।

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গতকাল সকাল ৮টা থেকে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি শুরু হয়। তবে বিকেলে ২৪ ঘণ্টার বদলে লাগাতার কর্মবিরতির ডাক দেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। এর আগে, গত শনিবার থেকে টানা তিন দিন প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করেছেন আন্দোলনকারীরা।

বন্দরের এই তিনটি টার্মিনাল—জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দিয়ে সিংহভাগ কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়। গত অর্থবছরের হিসাবে, বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি হওয়া মোট কনটেইনারের ৯৭ শতাংশ এই তিন টার্মিনালে ওঠানো-নামানো হয়েছে। বাকি তিন শতাংশ ওঠানো-নামানো হয় সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে পরিচালিত আরএসজিটি চিটাগং টার্মিনালে। ২০২৪ সালে সৌদি কোম্পানি টার্মিনালটি পরিচালনার দায়িত্ব পায়।

আরও পড়ুন

তবে চলমান আন্দোলনের আঁচ লাগেনি আরএসজিটি চিটাগং টার্মিনালে। পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এই টার্মিনালে কাজ হচ্ছে। গতকাল টার্মিনাল থেকে একটি জাহাজ ছেড়ে গেছে। আজ বুধবার আরেকটি জাহাজ ভেড়ানোর কথা রয়েছে টার্মিনালটিতে। একইভাবে বন্দরের বহির্নোঙরে আমদানি পণ্য নিয়ে আসা খোলা পণ্যবাহী জাহাজ থেকে পণ্য স্থানান্তর করে লাইটার জাহাজে নেওয়া হচ্ছে। এসব পণ্য নদীপথে পরিবহন হচ্ছে।

স্বাভাবিক সময়ে কনটেইনারবাহী যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায় এই ফটকটিতে। তবে আজ সকাল থেকেই সেটি অনেকটাই ফাঁকা। আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্র্রাম বন্দরের ৪ নম্বর ফটকে
ছবি: সৌরভ দাশ

দ্বিতীয় দিনেও জাহাজ চলাচল বন্ধ

গতকাল আন্দোলনকারীদের বাধার মুখে বন্দরের মূল তিনটি টার্মিনাল থেকে কোনো জাহাজ ছেড়ে যায়নি। কোনো জাহাজও জেটিতে ভেড়ানো যায়নি। আজ বুধবার সকালে জোয়ার শুরুর পর দুপুর পর্যন্ত কোনো জাহাজ আনা-নেওয়া হয়নি। জেটিতে কনটেইনারবাহী ১০টি জাহাজ আটকে আছে। কনটেইনারবিহীন পণ্যবাহী তিনটি জাহাজও আটকা।

জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানো যেমন বন্ধ আছে, তেমনি রপ্তানি পণ্যবাহী কোনো কনটেইনার বন্দরে ঢোকেনি। আমদানি পণ্যও খালাস হয়নি বন্দর চত্বর থেকে। মূল তিন টার্মিনালে অচলাবস্থার কারণে নতুন করে জাহাজও ভেড়ানো যাচ্ছে না।

আন্দোলনকারীরা যা বলছেন

চলমান আন্দোলন নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন আজ দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, এনসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে সরকার যাতে সরে আসে, সে জন্য এই আন্দোলন কর্মসূচি। শ্রমিক-কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন চালিয়ে গেলেও বিষয়টি সমাধানে সরকার থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

অচলাবস্থা নিরসনের উদ্যোগ নেই

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় জিটুজি ভিত্তিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হলে শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলনে নামেন।

শুরুর দিকে মিছিল-সমাবেশেই সীমাবদ্ধ ছিল আন্দোলন কর্মসূচি। বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ছাড়াও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটিসহ বিভিন্ন পেশাজীবী ও রাজনৈতিক সংগঠন কর্মসূচি পালন করেন। তবে এনসিটি চুক্তির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত ধাপে যাওয়ার পরই কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। আন্দোলনকে বৃহত্তর রূপ দিতে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। মূলত এই ব্যানারে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলন করছেন।

আরও পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় নিউমুরিং টার্মিনাল নির্মিত হয় ২০০৭ সালে। টার্মিনালটি নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি সংযোজনে বন্দর কর্তৃপক্ষ ধাপে ধাপে মোট ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কনটেইনারের সিংহভাগ এই টার্মিনাল দিয়ে পরিবহন হয়। বর্তমানে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড। বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার আগপর্যন্ত চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেডের এই টার্মিনাল পরিচালনা করার কথা রয়েছে।

টার্মিনালটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ১৫ বছর মেয়াদে ছেড়ে দেওয়া হবে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ছেড়ে দেওয়া হলে টার্মিনালের সব মাশুল কোম্পানিটিই আদায় করবে। তখন প্রতি কনটেইনারে ডিপি ওয়ার্ল্ড বন্দরকে কত ডলার পরিশোধ করবে, তা নিয়েই এখন দর-কষাকষি চলছে। ঢাকায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে এই দর-কষাকষি চলছে। গত সপ্তাহ থেকে এই দর-কষাকষি শুরু হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।

একদিকে ইজারাপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে, অন্যদিকে প্রতিবাদে চলছে শ্রমিক-কর্মচারীদের লাগাতার কর্মবিরতি। এরই মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হলেও বিষয়টি নিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেই সরকারের। আন্দোলনকারীদের সঙ্গেও আলোচনার উদ্যোগ নেই। উল্টো একের পর এক আদেশে কর্মচারীদের বদলির কারণে আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে।