মাছের পোনা বিক্রেতা যেভাবে হলেন ১৭টি খামারের মালিক

নোয়াখালীর সুবর্ণচরের আবদুল আজিজ একসময় বাইসাইকেলে গ্রামে গ্রামে মাছের পোনা বিক্রি করতেন। ২০১২ সালে ২০ শতক জমিতে পোনা উৎপাদন শুরু করেন। পরে নিজের কেনা ও লিজ নেওয়া মিলিয়ে ১৫ একর জমিতে গড়ে তোলেন ১৭টি হ্যাচারি। বছরে উৎপাদন করছেন এক থেকে দেড় কোটি রেণু ও পোনা। খরচ বাদ দিয়ে বছরে আয় করছেন প্রায় ১০ লাখ টাকা। তাঁর হ্যাচারিতে ১২ জন স্থায়ী শ্রমিকের পাশাপাশি ৬০ জন পোনা বিক্রেতা ও মাছ ব্যবসায়ী যুক্ত। ২০২৫ সালে জাতীয় মৎস্য পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি।

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে আবদুল আজিজের হ্যাচারিতে পোনা সংগ্রহের কাজ চলছেছবি: প্রথম আলো

একসময় বাইসাইকেলের পেছনে পাতিল নিয়ে নোয়াখালীর গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে বেড়িয়ে মাছের পোনা বিক্রি করতেন আবদুল আজিজ। তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতেন, পোনা উৎপাদনের খামার অর্থাৎ হ্যাচারি তৈরি করবেন। পোনা বিক্রির জমানো টাকা দিয়ে ২০ শতক জায়গায় শুরু করেছিলেন নিজের খামার। এখন তিনি ১৫ একর জমির ওপর ১৭টি মাছের হ্যাচারি প্রতিষ্ঠা করেছেন। আয় করছেন লাখ টাকা। তাঁর কারণে এলাকায় কর্মসংস্থান হয়েছে ৭০ জনের। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরবাটা ইউনিয়নের চর মজিদ গ্রামের সফল মাছচাষি আবদুল আজিজের কাছে প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে মাছচাষিরা আসেন পরামর্শ নিতে। তাঁর হ্যাচারি ও মাছের খামার গ্রামীণ অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে।

২০১২ সালে মাছ চাষে যুক্ত হন আবদুল আজিজ। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ২০ শতাংশ জমি দিয়ে শুরু করেন। শুরুতে মূলধনের অভাব ছিল। পোনা তৈরির জন্য ‘রেণুপোনা’ কেনার টাকা ছিল না। সেই সংকট কাটাতে আবদুল আজিজ স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ‘সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা’ থেকে মাত্র ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন। ওই সংস্থা থেকে পোনা উৎপাদনের প্রশিক্ষণও তিনি নিয়েছিলেন। নিষ্ঠা ও পরিশ্রমে একের পর এক বাধা ডিঙিয়ে পরবর্তী সময়ে তিনি খামারের পরিমাণ বাড়াতে থাকেন।

যেভাবে স্বাবলম্বী

২০১২ সালে মাছ চাষে যুক্ত হন আবদুল আজিজ। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ২০ শতাংশ জমি দিয়ে শুরু করেন। শুরুতে মূলধনের অভাব ছিল। পোনা তৈরির জন্য ‘রেণুপোনা’ কেনার টাকা ছিল না। সেই সংকট কাটাতে আবদুল আজিজ স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ‘সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা’ থেকে মাত্র ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন। ওই সংস্থা থেকে পোনা উৎপাদনের প্রশিক্ষণও তিনি নিয়েছিলেন। নিষ্ঠা ও পরিশ্রমে একের পর এক বাধা ডিঙিয়ে পরবর্তী সময়ে তিনি খামারের পরিমাণ বাড়াতে থাকেন। নিজের আয় দিয়ে কেনেন দুই একর জমি। আর লিজ নেন ১৩ একর। সাগরিকা উন্নয়ন সংস্থা থেকে ছয় লাখ টাকা এবং সোনালী ব্যাংক থেকে চার লাখ টাকার কৃষি ঋণ নেন। সব মিলিয়ে ১৫ একর ২০ শতাংশ জমিতে গড়ে তোলেন ১৭টি হ্যাচারি। জমির ভাড়া, কর্মচারীর বেতনসহ সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে হ্যাচারি থেকে তাঁর আয় প্রায় ১০ লাখ টাকা। বর্তমানে এসব হ্যাচারি থেকে বছরে এক থেকে দেড় কোটি মাছের রেণু ও পোনা উৎপাদিত হচ্ছে।

আবদুল আজিজের হ্যাচারি থেকে পোনা বিক্রেতারা পোনা সংগ্রহ করতে লাইন ধরেছেন
ছবি: প্রথম আলো

আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া

সনাতন পদ্ধতির মাছ চাষে ঝুঁকি বেশি ও লাভ কম থাকায় সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার মৎস্য কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় আবদুল আজিজ চাষে আধুনিকতা আনেন। সম্প্রতি সংস্থাটি থেকে ৪০–৪২ হাজার টাকা মূল্যের একটি ‘অ্যারোটর মেশিন’ (পানিতে অক্সিজেন বাড়ানোর যন্ত্র) পান তিনি। এই প্রযুক্তির সুফল সম্পর্কে আবদুল আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, আগে অ্যারোটর মেশিনের গুরুত্ব সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতেন না তিনি। কিন্তু প্রযুক্তির সহায়তায় পানিতে অক্সিজেনের সঠিক মাত্রা বজায় রেখে এখন তিনি রেণুপোনা বড় করতে পারছেন। এর সুফল পেয়ে তিনি নিজে আরও দুই থেকে তিনটি অ্যারোটর মেশিন কেনেন। স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থার মৎস্য কর্মকর্তারা নিয়মিত তাঁর খামার পরিদর্শনের মাধ্যমে মাছের রোগবালাই দমন ও সার্বিক সুরক্ষায় জরুরি পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।

খামারে কর্মসংস্থান

আবদুল আজিজ জানান, স্বল্প পুঁজি নিয়ে শুরু করা এই খামারে চলতি মৌসুমে প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার মাছের পোনা বিক্রি হলেও এখনো বিপুল পরিমাণ পোনা রয়েছে। মৌসুমে সম্পূর্ণ মাছ বিক্রি শেষে মোট আয় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন তিনি। বছর শেষে সব খরচ বাদ দিয়ে ১০ লাখ টাকা লাভ থাকে তাঁর।

আবদুল আজিজ কেবল নিজে স্বাবলম্বী হননি, গ্রামে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করেছেন। বর্তমানে তাঁর হ্যাচারিতে ১২ জন স্থায়ী শ্রমিক কাজ করছেন। তাঁদের প্রত্যেকের মাসিক বেতন ৯ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া ৬০ জন পোনা বিক্রেতা ও মাছ ব্যবসায়ী তাঁর কাছ থেকে পোনা নিয়ে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করে সংসার চালান। সেদিক থেকে ৭০–৭২টি পরিবার তাঁর খামারের ওপর নির্ভর করে।

মাছের পোনা বিক্রেতা মো. জায়েদ তাঁদের মধ্যে একজন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, আগে তাঁরা ময়মনসিংহসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে মাছের পোনা নোয়াখালীতে এনে বিক্রি করতেন। তখন আনার পথে অনেক সময় অর্ধেক পোনা নষ্ট হতো। তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। আবদুল আজিজ এখানে মাছের পোনা উৎপাদন করায় তাঁরা লাভবান হচ্ছেন। পোনা নষ্ট হয় না বলে তাঁদেরও ঝুঁকি কমেছে। আগের চেয়ে আয়ও বেড়েছে।

পোনা বিক্রেতা থেকে সফল খামারি বনে যাওয়া আবদুল আজিজ এখন লাখ টাকা আয় করেন
ছবি: প্রথম আলো

যা বলছেন মৎস্য কর্মকর্তারা

মাছের পোনা চাষে আবদুল আজিজের সাফল্য প্রসঙ্গে প্রকল্পের নিয়মিত তত্ত্বাবধানকারী সাগরিকার মৎস্য কর্মকর্তা মো. শহিদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ভালো পোনা মানেই ভালো মাছ উৎপাদন। তাই এই খাতের উন্নয়ন মাছ চাষে অনেক অগ্রগতি তৈরি করবে। প্রান্তিক পর্যায়ে আবদুল আজিজের মতো চাষিদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে চাষিরা পরিচিত হচ্ছেন। ব্যবহারও করছেন।

স্বীকৃতি

মৎস্য খাতে বিশেষ অবদান, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও স্বাবলম্বী হয়ে অন্যদের অনুপ্রেরণা জোগানোর স্বীকৃতিস্বরূপ আবদুল আজিজ ইতিমধ্যে একাধিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। আবদুল আজিজ জানান, ২০২২ সালে তিনি উপজেলা পর্যায় থেকে শ্রেষ্ঠ মৎস্যচাষি সম্মাননা স্মারক পেয়েছেন। ২০২৫ সালে তিনি জাতীয় মৎস্য পুরস্কার পদক পান। এ ছাড়া সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন সংস্থা পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) থেকেও জাতীয় সম্মাননা স্মারক অর্জন করেছেন তিনি।

নিজের সাফল্য প্রসঙ্গে আবদুল আজিজ বলেন, তাঁর দেখাদেখি চরবাটা ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার বহু বেকার যুবক এখন বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন। তবে খামার সম্প্রসারণে কিছু মৌলিক সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বিশেষ করে শুষ্ক বা খরা মৌসুমে এলাকায় তীব্র পানির সংকট দেখা দেয়। এই সংকট মোকাবিলায় তিনি সরকারের সহযোগিতা চান।