পড়ে আছে ছাত্রাবাস

কলেজে ছাত্রদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি, কিন্তু ছাত্রাবাস নেই। অবশ্য ১০০ শয্যার ছাত্রীনিবাস আছে। ছাত্রদের দাবির মুখে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি ১০০ শয্যার ৫ তলাবিশিষ্ট ছাত্রাবাস নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হয়। নির্মাণব্যয় ধরা হয় ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা। পঞ্চগড়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শেখ ট্রেডার্স এ কাজের দায়িত্ব পায়। ওই বছরের ৪ নভেম্বর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। দেড় বছরের মধ্যে অর্থাৎ, ২০১৭ সালের ২৬ এপ্রিল কাজ শেষ করার কথা ছিল। নির্দিষ্ট সময়ে নির্মাণের মূল কাজ শেষ হয়। তবে কাজ শেষ হওয়ার প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে, এখনো ভবনটি কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।

সম্মান চতুর্থ বর্ষের ছাত্র সাগর আহমেদ বলেন, ‘রংপুর থেকে এখানে পড়াশোনা করতে এসেছি। কলেজে ছাত্রাবাস নেই। থাকতে হয় আশপাশের মেসে। মেসের ভাড়া অনেক বেশি। পরিবেশও ভাল না।’ তিনি আরও বলেন, এখন ছাত্রদের মাসিক মেসভাড়া ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা (খাওয়ার খরচ বাদে) দিতে হয়। অথচ কলেজে ছাত্রীনিবাসে ছাত্রীরা মাসে ৩০০ টাকা দিয়েই থাকতে পারছেন।

নবনির্মিত ছাত্রাবাস পড়ে থাকা প্রসঙ্গে কলেজের অধ্যক্ষ মো. খলিলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্রাবাস নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও হস্তান্তর করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের ২৭ মে তৎকালীন গাইবান্ধা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার ঠিকাদারকে চিঠি দিয়ে তাগিদ দেন। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছে না।

বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী বেলাল আহমেদ বলেন, ভবনটি হস্তান্তরের জন্য ঠিকাদারকে বারবার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। তিনি নানা অজুহাতে এটি হস্তান্তর করছেন না। কালক্ষেপণের জন্য ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি কেন, জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং পঞ্চগড় জেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান শেখ বলেন, ‘আমার লাইসেন্সে গাইবান্ধার আনিছুর রহমান ছাত্রাবাস নির্মাণের কাজ করেন। ভবনটি হস্তান্তরের জন্য তাঁকে বারবার তাগাদা দিচ্ছি। প্রয়োজনে কাজ বাতিলের জন্য আমি নিজেই নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠি দেব। বিষয়টি পরিস্কার করব।’ তবে আনিছুর রহমান বলেন, ভবনের ভেতরে বৈদ্যুতিক কাজ বাকি আছে। তাই হস্তান্তরে বিলম্ব হচ্ছে। অচিরেই হস্তান্তর করা হবে।

শিক্ষক-কর্মচারীসংকট

এনাম কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব কলেজে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর বিষয় আছে, সেসব কলেজে প্রতিটি বিষয়ের জন্য ১২ জন করে শিক্ষক থাকার কথা। এ হিসাবে এ কলেজে ১৪টি স্নাতক (সম্মান) বিষয়ের জন্য ১৬৮ জন, ২টি স্নাতকোত্তর বিষয়ের জন্য ৮ জন এবং অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ মিলে ১৭৮ জন শিক্ষক দরকার। কিন্তু কলেজটিতে পদই আছে ৮২ জন শিক্ষকের। এই ৮২ জনের মধ্যে ২২ জন শিক্ষকের পদ শূন্য। এ ছাড়া কর্মচারী দরকার ৪৮ জন, আছেন মাত্র ৭ জন।

স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্র মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমাদের কলেজটা খুব সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। কিন্তু দুঃখ একটাই, পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। প্রতিদিন সকাল ১০টায় শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হই, কখন স্যার আসবেন। কোনো দিন স্যার আসেন, কোনো দিন বসে থেকেই দিন পেরিয়ে যায়। এভাবে কোনো দিন একটি, কোনো দিন দুইটি, আবার কোনো দিন পাঠদানই হয় না।’

অধ্যক্ষ খলিলুর রহমান বলেন, প্রয়োজনীয় শিক্ষক চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। প্রতি মাসে তাগাদাও দেওয়া হচ্ছে। কোনো কাজ হচ্ছে না।

এদিকে ক্যাম্পাসে বহিরাগত ব্যক্তিদের দৌরাত্ম্যে শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তারা ক্যাম্পাসে ঢুকে উচ্চ শব্দে হর্ন বাজিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে দাপিয়ে বেড়ায়। স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষের ছাত্র মিল্লাত হোসাইন জানান, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার অভাব আছে। বহিরাগত ব্যক্তিরা প্রায়ই ক্যাম্পাসে এসে টাকা, মুঠোফোন ছিনতাই করে। কোনো ছেলের সঙ্গে কোনো মেয়েকে কথা বলতে দেখলেই তাঁদের হেনস্তা করে। সম্প্রতি এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে একজন শিক্ষক লাঞ্ছিত হয়েছেন।

আছে নানা সমস্যা

কলেজে সমস্যার অন্ত নেই। স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের ছাত্র রেজাউল করিম বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই কলেজ মাঠে প্রায় হাঁটুপানি জমে যায়। বর্ষার সময় খেলাধুলা হয় না। মাঠটি ভরাট করা হচ্ছে না। এমনকি খেলাধুলার সামগ্রীও নেই।

চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী উম্মে হাবিবা বলেন, ‘এত বড় কলেজে ক্যানটিন আছে, কিন্তু মানসম্মত খাবার নেই। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। অবসরে গ্রন্থাগারে যাব, সেখানে পর্যাপ্ত আসন ও পর্যাপ্ত বই নেই।’