পবিত্র ঈদুল আজহায় চট্টগ্রাম নগরে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে পশুর হাট বসে ১০টি। এর বাইরে ছোট আকারের অনেক হাট বসে নগরের বিভিন্ন এলাকায়। অনেক ক্রেতা আবার কোরবানির পশু কেনেন ব্যক্তিমালিকানাধীন খামারে গিয়ে। এসব হাট ও খামারে গরু, ছাগল, মহিষসহ কোরবানির পশুর বেচাবিক্রির আর্থিক পরিমাণ কেমন, এমন প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পশুর হাটের ইজারা নিয়ে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রায়ই চলা বিবাদ-হানাহানি সেটি জানার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
নগরের হাটগুলোর ইজারা দেয় সিটি করপোরেশন। কোরবানিতে পশুর চাহিদা নির্ণয় করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। তবে নগরের পশুর হাটগুলোয় কোরবানির ঈদে কী পরিমাণ গরু-ছাগল বিক্রি হয় এবং তার বাজার মূল্য কত, এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে নেই। তবে সিটি করপোরেশন, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, পশুর হাটের ইজারাদারদের সঙ্গে কথা বলে নগরে পশুর হাটের বেচাবিক্রি সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া গেছে। তাঁদের মতে, কোরবানির ঈদে চট্টগ্রাম নগরের পশুর হাটগুলোয় অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকার গরু-ছাগল বিক্রি হয়। কোরবানির হাটে প্রায় দেড় লাখ গরু এবং ৫০ হাজার ছাগল বিক্রি হয় বলে তথ্য তাঁদের। তবে বাস্তবে এর কিছু বেশ-কম হতে পারে বলে তাঁরা জানান।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগর ও জেলা মিলিয়ে এবার কোরবানি পশুর মোট চাহিদা ৮ লাখ ১৬ হাজার। এর মধ্যে নগরে চাহিদা ১ লাখ ৫৮ হাজারের। আশপাশের উপজেলার অনেক বাসিন্দা নগরের হাটগুলো থেকে গরু-ছাগল কিনতে আসেন। কারণ, গ্রামগঞ্জের তুলনায় এসব হাটে বড় আকারের পশু পাওয়া যায়।
এবারের পবিত্র ঈদুল আজহা পালিত হবে ২৮ মে। চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর হাট বসে ঈদের ১০ দিন আগে থেকে। ঈদের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, হাটে হাটে গরু-ছাগলের বিক্রিও বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যাপারীরা নিজেদের গরু-ছাগল নিয়ে হাটগুলোয় এসেছেন বিক্রি করার জন্য। ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়ে হাটগুলো এখন জমজমাট। সকাল থেকেই ক্রেতাদের আনাগোনা শুরু হয়। তবে বিকেলের পর বেশি ভিড় জমে।
দেড় হাজার কোটি টাকার বাজার
চট্টগ্রাম স্থায়ী হাট আছে তিনটি। এসব হাট হচ্ছে-সাগরিকা পশুর হাট, বিবিরহাট পশুর হাট ও পোস্তারপাড় ছাগলের বাজার। তিনটির মধ্যে পোস্তারপাড়ে শুধু ছাগল বিক্রি হয়। অন্য দুটি হাটে গরু, ছাগলসহ কোরবানির অন্য পশুও বিক্রি করা হয়। চট্টগ্রাম নগরের সবচেয়ে বড় হাট হচ্ছে সাগরিকা পশুর হাট। ইজারাদারদের মতে, ঢাকার গাবতলী হাটের পর এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম হাট।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগর ও জেলা মিলিয়ে এবার কোরবানি পশুর মোট চাহিদা ৮ লাখ ১৬ হাজার। এর মধ্যে নগরে চাহিদা ১ লাখ ৫৮ হাজারের। আশপাশের উপজেলার অনেক বাসিন্দা নগরের হাটগুলো থেকে গরু-ছাগল কিনতে আসেন। কারণ, গ্রামগঞ্জের তুলনায় এসব হাটে বড় আকারের পশু পাওয়া যায়।
এবার নগরে অস্থায়ী হাট বসেছে সাতটি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হাট হচ্ছে নগরের বাকলিয়ার কর্ণফুলী পশুর হাট। এসব হাটের বাইরে নগরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরীহাট এলাকায় বড় পশুর হাট বসে। এ ছাড়া নগরে বর্তমানে ছোট-বড় ৫০টি গরুর খামার রয়েছে।
এসব পশুর হাট ও খামারে কী পরিমাণ গরু বিক্রি হয়, তার একটা ধারণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আলমগীর। তাঁর মতে, কোরবানির ঈদে চট্টগ্রাম নগরে পশুর হাটগুলোয় ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার গরু বিক্রি হয়। এবারও এই পরিমাণ গরু বিক্রি হতে পারে। ছাগল বিক্রি হতে পারে ৫০ থেকে ৬০ হাজার। অবশ্য হাটগুলোর ইজারাদারদের মতে, কোরবানির সময় ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি গরু-ছাগল বিক্রি হয় না। দুই পক্ষ ভিন্নমত দিলেও সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তার মতে, কোরবানিতে দেড় লাখ গরু-ছাগল বিক্রি হয়। হয়তো কিছু কম-বেশি হতে পারে।
চট্টগ্রাম নগরের পশুর হাটগুলোয় সব আকারের গরু, ছাগল ও মহিষ পাওয়া যায়। এখানে যেমন ৫০-৬০ হাজার টাকা দামের গরু যেমন পাওয়া যায়, তেমনি ৮-১০ লাখ টাকা দামের গরুও আছে হাটে। তবে মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা থাকে বেশি।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আলমগীরের মতে, নগরের পশুর হাটগুলোয় যেসব গরু বিক্রি হয় তার প্রতিটির গড় মূল্য এক লাখ টাকা। ছাগলেরও দাম গড়ে ১০-১৫ হাজার টাকা করে হবে।
এই প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি গরুর দাম গড়ে এক লাখ টাকা করে ধরা হলেও চট্টগ্রাম নগরের পশুর হাটগুলোয় কোরবানির সময় দেড় হাজার কোটি টাকার গরু বেচা-বিক্রি হয়। ছাগলের বাজার আনুমানিক ৭০ থেকে ৭৫ কোটি টাকা।
এদিকে সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, এবার তিনটি স্থায়ী ও সাতটি অস্থায়ী হাট ইজারা দিয়ে সংস্থাটি রাজস্ব পেয়েছে ১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ইজারাদারদের এর পাশাপাশি ২৫ শতাংশ হারে সরকারকে ভ্যাট ও আয়কর দিতে হয়। অর্থাৎ সে হিসেবে দিতে হবে আরও ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এ ছাড়া হাট ব্যবস্থাপনায় ইজারাদারদের এক থেকে দেড় কোটি টাকা খরচ করতে হয়। অর্থাৎ হাটের পেছনে ইজারাদারদের অন্তত ১৮ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। ইজারাদারদের মূল আয় হাসিল আদায়। বিক্রি হওয়া পশুর দামের বিপরীতে ৫ শতাংশ হারে হাসিল হিসেবে আদায় করে থাকেন তাঁরা।
চট্টগ্রাম নগরের সবচেয়ে বড় পশুর হাট সাগরিকা হাটের ইজারাদার পক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত আশিক রাব্বী প্রথম আলোকে বলেন, এই হাটে সাধারণত ৬০ থেকে ৭০ হাজার গরু বিক্রি হয়। এর আগে হাট থেকে তাঁরা হাসিল আদায় করেছিলেন সাত কোটি টাকা। তবে এবার ৮ কোটি টাকার বেশি দামে হাট নিয়েছেন। কিন্তু নগরের প্রবেশমুখের আগে একটি হাট বসে গেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যাপারীর গাড়ি আটকে জোর করে গরুগুলো ওই হাটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাই সাগরিকা হাটে গরুর পরিমাণ কমে গেছে। এ হাটে এবার আগের মতো গরু বিক্রি হবে কি না তা নিয়ে সংশয় আছে। তাঁদের বড় ক্ষতি হতে যাচ্ছে।
নগরের অস্থায়ী হাটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কর্ণফুলী পশুর হাটের ইজারাদার মো. ইব্রাহিম বলেন, এবার ১০ থেকে ১৫ হাজার গরু বিক্রি হবে। এক সময় এর চেয়ে বেশি গরু হতো। এখন বিভিন্ন জায়গায় খামার হয়েছে। এতে হাটগুলোয় গরুর পরিমাণ কমেছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রতিবছর ইজারাদারেরা হাট ইজারা নিয়ে লাভ করতে না পারার কথা বলেন। কিন্তু আবার হাট ইজারা নিতে লড়াই করেন। নিশ্চয় লাভ আছে। না হলে তো তাঁরা বারবার ইজারার জন্য দৌড়ঝাঁপ করতেন না। ইজারাদাররা অন্তত ২৫ কোটি টাকা হাসিল আদায় করবেন।’ তিনি বলেন, ইজারাদাররা গরু, ছাগল ও মহিষ বিক্রির যে হিসাব বলেন, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি বিক্রি হয়।