চট্টগ্রামে হামে আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতালে অবস্থানকালে সংক্রমিত হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতালে অবস্থানকালে হামে সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে।
এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের তৃতীয় গবেষণা প্রকল্পের ফলাফল উপস্থাপন অনুষ্ঠানে গবেষকেরা এ তথ্য জানান। আজ বুধবার দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সম্মেলনকক্ষে গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন করেন মুখ্য গবেষক কামরুন নাহার।
গবেষণায় ৩০০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ১৯৬টি ছিল শিশুদের এবং ১০৪টি ছিল মা ও শিশুর দুজনেরই নমুনা। শিশুদের নমুনা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং মা ও শিশু মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। ১৯৬ শিশুর নমুনার মধ্যে ১৭টির জিনোম সিকোয়েন্সিং করা হয়।
গবেষকেরা জানান, জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে হাম ভাইরাসের নতুন ধরন মেলেনি। সব কটি নমুনাতেই হাম ভাইরাসের বি৩ জিনোটাইপ শনাক্ত হয়েছে। গবেষণায় পাওয়া এই জিনোটাইপ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আগে শনাক্ত হওয়া বি৩ ভাইরাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
হাম প্রতিরোধী টিকার অবস্থাও গবেষণায় উঠে এসেছে। ১৯৬ শিশুর মধ্যে ১৬৭ শিশু বা ৮৫ দশমিক ২ শতাংশের টিকা নেওয়া ছিল না। তবে এর মধ্যে ৪৬ শতাংশ শিশু টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়সে পৌঁছায়নি। নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর পরও যারা টিকা নেয়নি, তাদের মধ্যে ৫২ শতাংশ সচেতনতার অভাব বা টিকা দেওয়ার তারিখ ভুলে যাওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ফলাফল উপস্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। এ ছাড়া চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বক্তব্য দেন।
এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের গবেষণা প্রকল্পটির সহযোগী হিসেবে ছিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, পেডিয়াট্রিক রিসার্চ গ্রুপ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।
জটিলতার বড় ঝুঁকি অপুষ্টি
হামে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের পাশাপাশি শিশুর পুষ্টিগত অবস্থাও রোগের জটিলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। গবেষণায় ১৯৬ শিশুর মধ্যে ৫১ শিশু বা ৩১ শতাংশের মাঝারি বা তীব্র অপুষ্টি ছিল। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে এই অপুষ্টিকেই গুরুতর জটিলতার সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্বাধীন ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অপুষ্টির পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের আর্থসামাজিক ও ভৌগোলিক অবস্থাতেও ঝুঁকির চিত্র পাওয়া গেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ গ্রামীণ বা প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এসেছে। ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ এসেছে নিম্ন আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবার থেকে।
গবেষণায় আক্রান্ত শিশুদের জটিলতার হারও ছিল বেশি। প্রায় ৮৭ শতাংশ শিশুর অন্তত একটি জটিলতা দেখা যায়। এসব জটিলতার মধ্যে নিউমোনিয়া ছিল সবচেয়ে বেশি। ৭৮ দশমিক ১ শতাংশ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। এ ছাড়া ডায়রিয়া, হৃদ্যন্ত্রের জটিলতা, শক ও মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতাও দেখা গেছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, টিকা নেওয়া শিশুদের তুলনায় টিকা না নেওয়া শিশুদের গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় দ্বিগুণ। টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে কোনো মৃত্যুও হয়নি।
এ ছাড়া মাত্র ৩২ দশমিক ১ শতাংশ শিশু আগের ছয় মাসে ভিটামিন এ ক্যাপসুল পেয়েছিল। ভিটামিন এ ক্যাপসুল না পাওয়া শিশুদের ৫৯ শতাংশের গুরুতর জটিলতা দেখা গেছে। তাই টিকাদানের পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টি ও ভিটামিন এ ক্যাপসুল সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গবেষণায় ৫৩ শতাংশ শিশুর হাম ছিল অত্যন্ত গুরুতর বা জটিল। ১৬৯ শিশু চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে মৃত্যুর হার ছিল ৩ দশমিক ৬।
টিকার পরিধি বাড়ানোর সুপারিশ
হাম প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদানের আওতা ৯৫ শতাংশের বেশি করার সুপারিশ করেছে গবেষণা দল। নিয়মিত টিকাদানের বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করে দ্রুত টিকার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৬ শতাংশ শিশু ৯ মাস বয়সের আগেই হামে আক্রান্ত হয়েছে। এ কারণে গবেষক দল হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়ার বয়স ৬ মাস করার সুপারিশ করেছে।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, হাম প্রতিরোধের দুটি বড় উপায় হলো টিকাদান ও আক্রান্ত রোগীকে পৃথক রাখা। হাসপাতালের পাশাপাশি বাড়িতেও আক্রান্ত রোগীকে পৃথক রাখতে হবে। তবে ছয় মাস বয়সে হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ জন্য বড় ধরনের অর্থায়ন প্রয়োজন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানানো হয়েছে।
গবেষণায় আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত শনাক্ত করে পৃথক রাখা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং হাসপাতালগুলোতে দ্রুত রোগী বাছাই, পৃথক রাখার ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া হামের রোগ নজরদারি, পরীক্ষাগারে রোগ নিশ্চিতকরণ, দ্রুত রোগ তদন্ত, শিশুদের পুষ্টিগত অবস্থার উন্নয়ন এবং নিয়মিত ভিটামিন এ ক্যাপসুল সরবরাহ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, গবেষণার ফলাফল একদিকে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, অন্যদিকে সতর্কবার্তা। প্রায় অর্ধেক শিশু নিয়মিত টিকাদানের বয়সে পৌঁছানোর আগেই হামে আক্রান্ত হয়েছে। তাই শুধু টিকা দেওয়াই নয়, সময়মতো টিকা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।