মেয়ের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে বাবা বললেন, ‘আমার সবকিছু শেষ’
‘কী বলব! আমার সবকিছুই শেষ। ওকে নিয়ে অনেক আশা ছিল। আমি ওকে লেখাপড়া করাচ্ছিলাম। ভেবেছিলাম, ভালো কিছু করবে। পরীক্ষা শেষ হলে ওকে ডিফেন্সে দেওয়ার চিন্তাও করেছিলাম। কিন্তু পরীক্ষার আরও কয়েকটি দিন বাকি থাকতেই এই দুর্ঘটনা ঘটল। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। আমার এখন আর কিছুই রইল না।’
গতকাল শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেয়ের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন মামুন মিয়া। সকালেই তাঁর মেয়ে নাফিসা নাওয়াল (১৮) তাঁকে বিদায় দিয়ে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। কিন্তু পরীক্ষাকেন্দ্রে আর পৌঁছানো হলো না তাঁর। কেন্দ্রে যাওয়ার পথেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান মামুন মিয়ার একমাত্র মেয়ে।
শনিবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা থানার নেভি হাসপাতাল গেটের বিপরীতে সড়কে একটি ‘টোয়িং’ ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন নাফিসা। তিনি অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল সেবায় করে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিলেন। সংঘর্ষে তিনি সড়কে পড়ে যান। পরে একজন শিক্ষানবিশ চিকিৎসক তাঁকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নাফিসা চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী। তিনি নগরের কাঠগড় এলাকার বাসিন্দা। গ্রামের বাড়ি বরগুনা জেলায়। গতকাল তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ের পরীক্ষা ছিল তাঁর। শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমেও সক্রিয় ছিলেন। কলেজের ‘অগ্রণী হাউসের’ দলনেত্রী ছিলেন তিনি।
গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশঘরের সামনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন নাফিসার বাবা মামুন মিয়া। মেয়েকে হারিয়ে তিনি এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে কথাও বলতে পারছিলেন না। তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন স্বজনেরা।
নাফিসার মৃত্যুর ঘটনার খবর পেয়ে পরিবারের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন সিএমপি স্কুল অ্যান্ড কলেজের উপাধ্যক্ষ ববি বড়ুয়া। নাফিসাকে কেবল একজন শিক্ষার্থী হিসেবে চিনতেন না তিনি। ক্লাসের একটা সমস্যা হওয়ায় একদিন নাফিসাকে তাঁর অফিসে পাঠানো হয়েছিল। সেদিন দীর্ঘ সময় কথা হয়েছিল দুজনের। তিনি বলেন, ‘ওকে না দেখে মনটা মানছিল না। তাই গিয়েছিলাম। আমরা খুবই মর্মাহত।’
মুঠোফোনে ববি বড়ুয়া বলেন, ‘খুব ভদ্র ছিল, খুবই সাদামাটা ছিল। খুব প্রাণচঞ্চল একটা মেয়ে ছিল। ওকে একদিন আমার কাছে পাঠানো হয়েছিল। সেদিন অনেকক্ষণ কথা বলেছি। কথা বলতে বলতে ওর সঙ্গে আমার একটা সখ্য গড়ে ওঠে। ওকে কাছ থেকে চেনার সুযোগ হয়েছিল।’
শনিবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা থানার নেভি হাসপাতাল গেটের বিপরীতে সড়কে একটি ‘টোয়িং’ ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন নাফিসা। তিনি অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল সেবায় করে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিলেন। সংঘর্ষে তিনি সড়কে পড়ে যান। পরে একজন শিক্ষানবিশ চিকিৎসক তাঁকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
ববি বড়ুয়া বলেন, ‘ও বিভিন্ন বিষয়ে আমার সঙ্গে শেয়ার করত। তখন আমি যতটুকু সম্ভব ওকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করতাম। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমেও সক্রিয় ছিল নাফিসা। কলেজের চারটি হাউসের একটি, অগ্রণীর লিডার ছিল সে। ও একটা লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছিল। ওকে বড় হতে হবে, মানুষের মতো মানুষ হতে হবে—এমন একটা তাগিদ ওর মধ্যে ছিল।’
বন্যা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে গত ৮ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত ছিল। গত বৃহস্পতিবার থেকে স্থগিত পরীক্ষাগুলো আবার শুরু হয়। গতকাল ছিল তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ের পরীক্ষা। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অর্থনীতি দ্বিতীয় পত্র ও প্রকৌশল অঙ্কন ও ওয়ার্কশপ প্র্যাকটিস দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা দিয়ে শেষ হবে চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি। তবে এ পরীক্ষায় আর অংশ নিতে পারবেন না নাফিসা।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী গতকাল রাত ৯টার দিকে পরীক্ষার্থীদের উপস্থিতির তালিকা দেন। এদিন পরীক্ষার্থী ছিল ৮১ হাজার ৩৩৬ জন। অনুপস্থিত ২ হাজার ৪৩৮ জন। চট্টগ্রাম জেলায় অনুপস্থিত ছিল ১ হাজার ৬০৪ জন। তাঁদের একজন নাফিসা নাওয়াল। শুধু গতকালের পরীক্ষায় নয়, জীবনের বাকি পরীক্ষাগুলোতেও আর উপস্থিত হতে পারবেন না তিনি।
অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, ‘সকালে খবরটি শোনার পর আমরা খুবই মর্মাহত হই। পরে কেন্দ্র ও তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আমরা বিষয়টি জানতে পারি। তাঁর জন্য আমরা সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি।’
পুলিশ জানায়, নাফিসাকে যে ট্রাকটি ধাক্কা দিয়েছিল সেটি টোয়িং ট্রাক। সাধারণত বিকল বা দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন টেনে নেওয়া এবং সড়ক থেকে সরানোর কাজে এ ধরনের ট্রাক ব্যবহার করা হয়। এ ঘটনায় নাফিসার বাবা মামুন মিয়া বাদী হয়ে চট্টগ্রাম ইপিজেড থানায় মামলা করেছেন। মামলায় টোয়িং ট্রাকের চালককে আসামি করা হয়েছে। তবে ঘটনার পর তিনি পালিয়ে যান।
চট্টগ্রাম ইপিজেড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনার ঘটনায় নাফিসার বাবা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। মামলায় টোয়িং ট্রাকের চালককে আসামি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর তিনি পালিয়ে যান। তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।