র্যাব কর্মকর্তা নিহত ও হামলার পেছনে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্বের বিষয় উঠে আসছে। একটি পক্ষ র্যাবকে ভুল তথ্য দিয়ে আরেক পক্ষকে ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। র্যাবের তথ্যদাতাকে (সোর্স) এলাকায় দেখেই একটি পক্ষ ইট ছুড়তে থাকে ও লাঠি নিয়ে হামলা চালায়। এ সময় সাদাপোশাকে থাকা র্যাব সদস্যরাও হামলা মুখে পড়ে যান। পরে ওই তথ্যদাতা এবং র্যাবের চার সদস্যকে ৩ কিলোমিটার ভেতরে দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে মারধর করে। পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
পুলিশ ও জঙ্গল সলিমপুরের স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দুটি সন্ত্রাসী পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মো. ইয়াসিন ও অপর পক্ষে রোকন উদ্দিন। রোকন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক (বহিষ্কৃত)। আর ইয়াসিন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীতাকুণ্ডের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আল মামুনের অনুসারী ছিলেন। কিন্তু ৫ আগস্টের পর দুজনই বিএনপির এক নেতার অনুসারী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়ে আসছেন। র্যাবের ওপর হামলার আগে গত বছরের অক্টোবরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিহত হন। পরদিন সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলা ও মারধরের শিকার হয়েছেন দুই সাংবাদিক।
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটি। এর বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে ৩ হাজার ১০০ একর জায়গায় জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। সীতাকুণ্ডে এর অবস্থান নগরের কাছে। এলাকাটির পূর্ব দিকে রয়েছে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ থানা।
জঙ্গল সলিমপুর দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এটি হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা। চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এখনো পাহাড় কেটে চলছে প্লট–বাণিজ্য। আর এই বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী। এলাকাটি সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে এসব সন্ত্রাসী।
দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বহিষ্কৃত যুবদল নেতা রোকন উদ্দিন ও পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী মো. ইয়াসিনের বিরোধ চলছিল। এর মধ্যে সোমবার ইয়াসিনের লোকজন ওই এলাকায় বিএনপির একটি কার্যালয় উদ্বোধনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সেখানে ইয়াসিনসহ কয়েকজন সন্ত্রাসী আসতে পারে—এই তথ্যের ভিত্তিতে র্যাবের ৪০ জনের একটি দল জঙ্গল সলিমপুরে গেলে হামলার শিকার হন। এ সময় অন্য সদস্যরা সরে আসতে পারলেও র্যাবের চার সদস্য ও তাঁদের তথ্যদাতাকে (সোর্স) আটকে ফেলে ইয়াসিনের লোকজন। পরে তাঁদের অটোরিকশায় করে তিন কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ের ভেতর নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিয়ে তাঁদের মারধর করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে একদল পুলিশ ৩ কিলোমিটার ভেতর থেকে চার র্যাব কর্মকর্তাসহ পাঁচজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। তাঁদের মধ্যে র্যাবের উপসহকারী পরিচালক-ডিএডি (নায়েব সুবেদার) মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া মারা যান। আহত বাকি তিন র্যাব সদস্য সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁরা আশঙ্কামুক্ত।
এলাকার বাসিন্দারা জানান, ইয়াসিনকে সরিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিতে গত বছরের ৫ আগস্টের পর হামলা চালান বহিষ্কৃত যুবদল নেতা রোকন উদ্দিনের পক্ষের লোকজন। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৪ অক্টোবর ভোরে নগর ও জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর দখলের চেষ্টা করেন রোকনের লোকজন। এ সময় তাঁর অনুসারী খলিলুর রহমানকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আহত হন অন্তত আরও ২৫ জন। এই ঘটনায় নিহত ব্যক্তির বাবা বাদী হয়ে মামলা করে। সম্প্রতি আলীনগরের পাহাড় দখলে নিতে অস্ত্র কেনার একটি কথোপকথন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অস্ত্রের কথা বলা ওই ব্যক্তি বহিষ্কৃত যুবদল নেতা রোকন উদ্দিন বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। কথোপকথনে বলতে শোনা যায়, ‘ছিন্নমূলে আমি যুদ্ধ করতে রাজি আছি।’
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইয়াসিন সীতাকুণ্ডের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আল মামুনের আশ্রয়ে ছিলেন। এখন তিনি নিজেকে বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন। রোকন উদ্দিনও আসলাম চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তবে এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে আসলাম চৌধুরী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে তাঁর কোনো অনুসারী নেই। ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত নন।
এই বিষয়ে বক্তব্যের জন্য রোকন ও ইয়াসিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তাদের পাওয়া যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে দুজনই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন দাবি করেন। ইয়াসিনের অনুসারী কয়েকজন ভিডিও বক্তব্যে দাবি করা হয়েছে র্যাবকে ভুল তথ্য দিয়ে তাদের ওপর হামলার জন্য আনা হয়েছে।
সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য সলিমপুরে এত অল্প সদস্য নিয়ে র্যাব কেন অভিযানে গেল, প্রশ্নের উত্তরে র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহীদুর রহমান গতকাল বলেন, ‘প্রায় ৫০ জনের ওপরে র্যাব সদস্য ছিলেন। অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করা যাবে, এ ধরনের একটা ধারণার বশবর্তী হয়ে তাঁরা সেখানে যান। এখন একটা তদন্ত কমিশন গঠন করেছি। তারা অনুসন্ধান করে দেখবে, অভিযানে কোনো ত্রুটি ছিল কি না।’