দাবদাহে বেড়ায় মাঠার কদর তুঙ্গে, দামও বেড়েছে
দাবদাহে হাঁসফাঁস করছে মানুষ। তৃষ্ণা মেটাতে পানি, ফলের রস, কোমল পানীয়সহ সব ধরনের পানীয়ের চাহিদা বেড়ে গেছে। তবে পাবনার বেড়া উপজেলায় এসব পানীয়ের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী মাঠার চাহিদা এখন তুঙ্গে। এই চাহিদা বাড়ে বিকেলে। পবিত্র রমজান মাসে এমনিতেই বিশেষ এই পানীয়ের চাহিদা থাকে বেশি। এবার এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রচণ্ড গরম।
দুপুর ১২টা থেকে মাঠার অস্থায়ী দোকানগুলোর সামনে ক্রেতাদের লম্বা লাইন দেখা যায়। চাহিদা তুঙ্গে ওঠায় সরবরাহে টান পড়েছে, ফলে বেড়েছে মাঠার দাম।
মাঠা মূলত দুধ থেকে তৈরি করা বিশেষ ধরনের ঘোল। তবে বেড়ায় এই ঘোলের স্বাদ ও বর্ণ দেশের অন্য এলাকার চেয়ে আলাদা। স্থানীয়ভাবে এই ঘোল ‘মাঠা’ নামে পরিচিত। উপজেলার মানুষ মনে করেন, এই মাঠা আলাদা স্বকীয়তায় ভরা এবং ইতিমধ্যেই এটি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পানীয় হয়ে উঠেছে।
বেড়া দেশের অন্যতম গরুর দুধ উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে পরিচিত। এই এলাকার গরুর দুধ ভালো হওয়ায় মাঠার স্বাদও অন্য এলাকার চেয়ে ভালো বলে মনে করেন এ উপজেলার মানুষ। মাঠা তৈরির জন্য আগের দিন বিকেলের মধ্যে দুধ সংগ্রহ করে জ্বাল দিয়ে দইয়ের মতো জমানো হয়। এর পর রাত তিনটা থেকে চারটার মধ্যে শুরু হয় মাঠা তৈরির মূল প্রক্রিয়া। জমানো দুধ বড় পাত্রে রেখে তা ভালোভাবে ব্লেন্ড করতে হয়। মাঠা তৈরির কারিগর বা ঘোষরা ম্যানুয়ালি ব্লেন্ড করে থাকেন। স্থানীয়ভাবে একে টানা বলা হয়। জমানো দুধ টানার কাজটি অত্যন্ত পরিশ্রমের। এভাবে সকাল সাত থেকে আটটার মধ্যে মাঠা তৈরির কাজ শেষ হয়। দুপুর ১২টার মধ্যে সেই মাঠা বাজারে নিয়ে আসা হয়।
মাঠার নিয়মিত ক্রেতা ও এটি তৈরির সঙ্গে জড়িত ঘোষরা জানান, এবার পবিত্র রমজান মাসের শুরুতে তুলনামূলক শীতল আবহাওয়া থাকায় মাঠার চাহিদা কম ছিল। কিন্তু গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে এর চাহিদা। কয়েক দিন ধরে তীব্র দাবদাহে মাঠার চাহিদা তুঙ্গে উঠেছে। উপজেলার মাঠা বিক্রেতারা উৎপাদন বাড়িয়েও চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। চাহিদা বাড়ায় মাঠার দামও বেড়েছে।
সরেজমিনে জানা যায়, পবিত্র রমজান মাসের শুরুতে বেড়ার ঐতিহ্যবাহী বিশু ঘোষের মাঠা প্রতি লিটার ৫০ টাকা, সলপের মাঠা ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ পাঁচ-ছয় দিন ধরে বিশু ঘোষের মাঠার দাম লিটারে ১০ টাকা বেড়ে ৬০ টাকায় এবং সলপের মাঠার দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে ১২০ ও ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুধের দাম লিটারে প্রায় ২০ টাকা বেড়ে যাওয়াতেই মাঠার দাম এমন বেড়েছে বলে এর উৎপাদনকারীরা জানান।
উপজেলায় বেশ কয়েকজন ঘোষ মাঠা তৈরি করলেও সবার শীর্ষে রয়েছে বিশু ঘোষের নাম। প্রায় ৫০ বছর ধরে তিনি উপজেলায় মাঠার চাহিদা মিটিয়ে চলেছেন। তাঁর তৈরি মাঠার সুনাম রয়েছে বেড়াসহ আশপাশের উপজেলাগুলোতে। সাধারণত দুপুর ১২টার দিকে তিনি প্রায় ২০ মণ (৮০০ লিটার) মাঠা নিয়ে বাজারে বসার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় সারি ধরে ক্রেতাদের মাঠা কেনা। দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায় তাঁর সব মাঠা। রমজানের শুরুতে তাঁর মাঠা ৫০ টাকা লিটার বিক্রি হলেও এখন তিনি ৬০ টাকা লিটার বিক্রি করছেন।
বিশু ঘোষ বলেন, ‘রমজানের শুরুতে গরুর দুধের দাম ৬০ টাকা থাকলিও এখন ৮০ টাকায় কিনা লাগত্যাছে। তাই বাধ্য হয়া মাঠার দাম লিটারে ১০ টাকা বাড়ান লাইগলো। আমার মাঠা সগলেই পছন্দ করে। আরও দশ-বারো মণ মাঠা বানালিও শেষ হয়া যাবি। কিন্তু অতিরিক্ত মাঠা বানানোর আর কোনো সুযুগ আমার নাই।’
বেড়ার পাশের শাহজাদপুর উপজেলার সলপ গ্রামে তৈরি হওয়া মাঠারও বেশ সুনাম রয়েছে। অনেকেই সেখান থেকে এই মাঠা এনে বিক্রি করেন। তবে দাম বেশি হওয়ায় এই মাঠার চাহিদা বেড়ায় কিছুটা কম। সপ্তাহখানেক হলো এই মাঠা লিটারে ২০ টাকা বেড়ে এখন ১২০ ও ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বেড়া বাজারের সলপের মাঠা বিক্রেতা রাম দত্ত বলেন, ‘দুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদনকারী মাঠার দাম বাড়িয়েছেন। বেড়ায় বিশু ঘোষের মাঠার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এর পরেই রয়েছে সলপের মাঠার চাহিদা।’
বেড়ার মনজুর কাদের মহিলা কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, মাঠার সঙ্গে লেবু ও বরফের কুচি মিশিয়ে ইফতারির জন্য সরবত বানানো বেড়ার পুরোনো ঐতিহ্য। এর ওপর এবার দাবদাহের কারণে ইফতারের অনুষ্ঠানসহ বাড়ির ইফতারে মাঠা এখন অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠেছে।