গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, বাড়তি ভাড়া গুনছেন যাত্রীরা

গ্যাসের জন্য অটোরিকশার দীর্ঘ লাইন। চট্টগ্রাম নগরের ষোলোশহর এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

অফিসে যাওয়ার জন্য আতুরার ডিপো থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন রিজওয়ান উদ্দিন। গন্তব্য প্রবর্তক মোড়। সাধারণ সময়ে এ পথে ভাড়া লাগে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা। কিন্তু গতকাল শনিবার তাঁকে ভাড়া দিতে হয়েছে ১৭০ টাকা। গন্তব্যে পৌঁছে চালক রিজওয়ানকে বলেন, ‘মামা, ২০টা টাকা বাড়ায় দিয়েন। এখন গ্যাসের সংকট। গ্যাস নিতে কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে।’

রিজওয়ান প্রথম আলোকে বলেন, চালকের কথায় তিনি বাড়তি ভাড়া দিয়েছেন। তবে এভাবে প্রতিদিন ভাড়া বাড়লে সাধারণ যাত্রীদের ওপর চাপ বাড়বে। তাঁর ভাষায়, ‘গ্যাসের সংকটে চালকেরা কষ্ট পাচ্ছেন। কিন্তু সেই খরচের একটা অংশ শেষ পর্যন্ত যাত্রীদেরই দিতে হচ্ছে।’

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান ফয়’স লেক এলাকার আরেক বাসিন্দা। তিনিও ৩০ টাকা বাড়তি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে গেছেন। চট্টগ্রামে চলমান গ্যাস–সংকট এখন বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানা ছাড়িয়ে সড়কেও প্রভাব ফেলছে। নগরের বেশির ভাগ সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস না থাকায় কিংবা চাপ কম থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে অটোরিকশাচালকদের। এতে দিনের বড় অংশ নষ্ট হচ্ছে। কমছে তাঁদের আয়। কোথাও কোথাও যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়াও চাওয়া হচ্ছে।

গ্যাসের লাইনে কেটে যাচ্ছে কর্মঘণ্টা

গতকাল ভোর ছয়টায় অটোরিকশা নিয়ে বের হন চালক মোহাম্মদ ফারুক। প্রথমে যান ওয়াসার একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে। সেখানে গ্যাস ছিল না। এরপর যান টাইগারপাসে। সেখানেও একই অবস্থা। পরে তিনি জানতে পারেন, ষোলশহরের ফসিল ফিলিং স্টেশনে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। সেখানে গিয়ে দেখেন, স্টেশন থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূর পর্যন্ত অটোরিকশার সারি। সকাল সাড়ে সাতটায় লাইনে দাঁড়ান ফারুক। বেলা সাড়ে ১১টায়ও গ্যাস পাননি। তখন প্রথম আলোর সঙ্গে কথা হয় তাঁর। ফারুক বলেন, ‘আজ পুরো দিনটাই গ্যাসের জন্য চলে যাচ্ছে। দিনে ১ হাজার ৮০ টাকা গাড়ির মালিককে দিতে হয়। কখন ভাড়া মারব, কখন এই টাকা তুলব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, গতকাল শনিবার সকাল আটটা থেকে আজ রোববার সকাল আটটা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে মাত্র ২১ কোটি ঘনফুট গ্যাস। অথচ চাহিদা অন্তত ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ গ্যাস পাওয়া গেছে। প্রায় ১৪ কোটি ঘনফুট ঘাটতি ছিল।

সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েক শ অটোরিকশা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িগুলো এগোচ্ছে খুব ধীরে। কারণ, ফিলিং স্টেশনেও গ্যাসের চাপ কম। চালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন সকাল ১০টা থেকে লাইনে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘তিনটা ফিলিং স্টেশন ঘুরে এখানে এসেছি। কোথাও গ্যাস পাইনি। এখানেও চাপ কম। দিনে আয় করি, দিনে খাই। গ্যাস না পেলে সংসার চলবে কীভাবে?’

চালকেরা বলছেন, গ্যাসের জন্য তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে তাঁরা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম যাত্রী পরিবহন করতে পারছেন। কিন্তু গাড়ির জমা, খাবার ও অন্যান্য খরচ আগের মতোই দিতে হচ্ছে। এ কারণে কোনো কোনো চালক বাড়তি ভাড়া চাইছেন।

না খেয়েই বের হয়েছেন ঝরনা

গ্যাস–সংকটে বাসাবাড়ির দুর্ভোগও বেড়েছে। দক্ষিণ নালাপাড়া এলাকার বাসিন্দা ঝরনা বড়ুয়ার ঘরে গতকাল রাত ১০টার পর থেকে চুলা জ্বলেনি। সকালে ঘুম থেকে উঠেও গ্যাস পাননি। রান্না হয়নি। তাই না খেয়েই কর্মস্থলে বের হন তিনি। তাঁর সন্তানও না খেয়ে স্কুলে গেছে।

আজ পুরো দিনটাই গ্যাসের জন্য চলে যাচ্ছে। দিনে ১ হাজার ৮০ টাকা গাড়ির মালিককে দিতে হয়। কখন ভাড়া মারব, কখন এই টাকা তুলব, কিছুই বুঝতে পারছি না।
মোহাম্মদ ফারুক, অটোরিকশার চালক।

ঝরনা বড়ুয়া একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরেই গ্যাসের চাপ খুব কম ছিল। মিটমিট করে চুলা জ্বলত। কিন্তু গতকাল রাত থেকে একেবারেই গ্যাস নেই। রাতের খাবারও হোটেল থেকে কিনে খেতে হয়েছে।’

নগরের বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা সুলতানা জাহানের বাসায় সকাল সাতটার দিকে গ্যাস চলে যায়। দুপুর ১২টা পর্যন্ত তা ফেরেনি। তিনি বলেন, ‘রান্না হয়নি। বাচ্চার জন্য হোটেল থেকে খাবার আনতে হবে।’

কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির (কেজিডিসিএল) হিসাবে, আগ্রাবাদ, হালিশহর, আনন্দবাজার, বাকলিয়া, পতেঙ্গাসহ নগরের অর্ধশতাধিক এলাকায় আবাসিক গ্রাহকেরা সমস্যায় পড়েছেন। নগরের বাইরের বিভিন্ন এলাকায়ও একই সংকট চলছে।

চাহিদার চেয়ে ১৪ কোটি ঘনফুট কম

কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, গতকাল সকাল আটটা থেকে আজ রোববার সকাল আটটা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে মাত্র ২১ কোটি ঘনফুট গ্যাস। অথচ চাহিদা অন্তত ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ গ্যাস পাওয়া গেছে। প্রায় ১৪ কোটি ঘনফুট ঘাটতি ছিল। সকাল আটটার পর সরবরাহ আরও কমেছে বলে কোম্পানি সূত্র জানিয়েছে। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় সরবরাহ ২০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে।

কেজিডিসিএলের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিদিন কোন বিতরণ কোম্পানি কতটুকু গ্যাস পাবে, তা নির্ধারণ করে পেট্রোবাংলা। ঢাকায় সংকট বেশি হওয়ায় পরিস্থিতির ভারসাম্য আনতে চট্টগ্রামের বরাদ্দও কমানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘জাতীয় গ্রিডে যতটুকু গ্যাস আছে, সেটিই বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে। পেট্রোবাংলার বরাদ্দ অনুযায়ী চট্টগ্রামে লোড ম্যানেজমেন্ট করা হচ্ছে।’

সংকট মোকাবিলায় বড় শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও অন্যান্য বড় গ্রাহকের গ্যাসের চাপ কমিয়েছে কেজিডিসিএল। কোম্পানি সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক সরবরাহ ৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমিয়ে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট করা হয়েছে। সার কারখানায় ৪৮ থেকে কমিয়ে ৪২ মিলিয়ন ঘনফুট দেওয়া হচ্ছে। ইউনাইটেড পাওয়ারের বরাদ্দ ১৩ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমিয়ে ৭ মিলিয়ন ঘনফুটে নামানো হয়েছে।

গ্যাসের জন্য সকাল ১০টায় সারিতে দাঁড়ান চালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন। বেলা সোয়া ১১টা পর্যন্ত তিনি গ্যাস পাননি। বেলা সোয়া ১১টায় নগরের ষোলোশহরে
ছবি: প্রথম আলো

টার্মিনালে আগুনের পর সংকট

দেশে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি ও অন্যটি সামিট এলএনজি টার্মিনাল।

দুটি টার্মিনাল থেকে স্বাভাবিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস যোগ হতো। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুন লাগার পর সরবরাহ ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে আসে। এতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে দেশের পূর্বাঞ্চলে। কেজিডিসিএলের আওতাধীন চট্টগ্রাম ছাড়া বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আওতায় থাকা কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরে সংকট বেড়েছে। ঢাকায়ও গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, মেরামতের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে এনে টার্মিনালে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দেশীয় প্রকৌশলীরাও কাজ করছেন। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালের অক্ষত বয়লার থেকে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ চালুর চেষ্টা চলছে। দু–এক দিনের মধ্যে আংশিক সরবরাহ শুরু হতে পারে। তবে টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হতে আরও সময় লাগবে।