উখিয়ায় দুই রোহিঙ্গা নেতাকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ৪

হাতকড়া
প্রতীকী ছবি

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায় আশ্রয়শিবিরে ‘প্রত্যাবাসনের পক্ষে কাজ করা’ দুই রোহিঙ্গা নেতাকে (মাঝি) কুপিয়ে হত্যার তিন দিন পর মামলা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকালে নিহত আনোয়ারের বড় ভাই বাদী হয়ে উখিয়া থানায় ২০ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা ১৪ থেকে ১৫ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চার রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। এর আগে গত শনিবার সন্ধ্যায় উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের তাসনিমারখোলা (ক্যাম্প-১৩) আশ্রয়শিবিরের এ ব্লকের সাব-মাঝি আবুল কালামের দোকানের সামনে একদল রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী মো. আনোয়ার (৩৮) ও মৌলভী মো. ইউনুসকে (৩৮) কুপিয়ে হত্যা করে।

আরও পড়ুন

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন ক্যাম্প-১৩-এর ডি ব্লকের কালা মিয়ার ছেলে সামসু আলম (৫২), একই ব্লকের সাব্বির আহমদের ছেলে রশিদ আহমদ (৫৩), এফ ব্লকের মৌলভী জুবায়ের আহমদের ছেলে মাহবুবুর রহমান (২৮) ও ক্যাম্প-১৯-এর সি ব্লকের আলী আহমদের ছেলে নজির আহম্মদ (৪৭)।

রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ৮ এপিবিএনের সহকারী পুলিশ সুপার (অপারেশন অ্যান্ড মিডিয়া) মো. ফারুক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত চার রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে এপিবিএন। অন্য আসামিদের ধরতে আশ্রয়শিবিরে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে।

এপিবিএন জানায়, আসামিদের শনাক্ত এবং দুই রোহিঙ্গা নেতার লাশ ময়নাতদন্ত ও দাফন সম্পন্ন করতে সময় লাগায় মামলা করতে বাদীর কিছুটা দেরি হয়েছে। গ্রেপ্তার চারজনকে উখিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, গত শনিবার সন্ধ্যায় তাসনিমারখোলা আশ্রয়শিবিরে একদল রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী মো. আনোয়ার (৩৮) ও মৌলভী মো. ইউনুসের (৩৮) ওপর হামলা করে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। হামলায় ইউনুস ঘটনাস্থলেই নিহত হন। গুরুতর আহত অবস্থায় আনোয়ারকে উদ্ধার করে আশ্রয়শিবিরের এমএসএফ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত ইউনুস ওই শিবিরের এফ ব্লকের ২ নম্বর শেডের মৌলভী সৈয়দ করিমের ছেলে এবং আনোয়ার একই শেডের নুর মোহাম্মদের ছেলে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আশ্রয়শিবিরের কয়েক রোহিঙ্গা নেতা বলেন, নিহত ইউনুস ও আনোয়ার ক্যাম্পে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ, ক্যাম্পের দোকানপাটে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে স্বেচ্ছাসেবী রোহিঙ্গা তরুণ ও যুবকদের নিয়ে আশ্রয়শিবিরে রাত্রিকালীন পাহারার ব্যবস্থা করেছিলেন। এ ছাড়া তাঁরা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে কাজ করতেন এবং রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের অবস্থান, তৎপরতা সম্পর্কে এপিবিএনসহ গোয়েন্দা সংস্থাকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতেন। এ জন্য মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সমর্থক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা তাঁদের প্রাণনাশের হুমকি দিত। শনিবার সন্ধ্যায় দুই নেতার ওপর আরসার সদস্য ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে অন্তত ৩০-৩৫ জনের একদল রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী হামলা করে। দলের অন্তত ছয়জন আরসার সদস্যকে চিনতে পেরেছে ঘটনাস্থলে উপস্থিত রোহিঙ্গারা।

নিহত রোহিঙ্গা নেতাদের এক স্বজন প্রথম আলোকে বলেন, গত শনিবার সন্ধ্যায় সাব-মাঝি আবুল কালামের দোকানের সামনে বসে ভাসানচরে যেতে রাজি রোহিঙ্গাদের তালিকা তৈরি ও তাঁদের রেখে যাওয়া ঘরবাড়ির বণ্টন নিয়ে সাধারণ রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন নিহত দুই মাঝি। এ সময় হামলার ঘটনা ঘটে। এর কয়েক দিন আগে ভাসানচরে রোহিঙ্গা না পাঠানো, দোকান থেকে চাঁদা তুলে দেওয়া এবং মাদক ব্যবসা পরিচালনা নিয়ে আরসার সদস্যরা দুই মাঝিকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যায়।

পুলিশ ও রোহিঙ্গা নেতারা জানান, গত চার মাসে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে ১৪ জনকে হত্যার ঘটনায় ১২টি মামলা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের তালিকায় নেতা ৭ জন, রাত্রিকালীন পাহারা দলের স্বেচ্ছাসেবী সদস্য ২ জন। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীর গুলিতে দুজন আরসা সদস্যও খুন হয়েছেন। এসব মামলায় গ্রেপ্তার ২৭ রোহিঙ্গার মধ্যে আরসার সদস্য ৭ জন।