সংকেত মানেননি লোকোমাস্টার, সান্তাহারে নীলসাগর এক্সপ্রেস লাইনচ্যুতির ঘটনায় আহত অন্তত ৬৬

নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি বগুড়ার আদমদীঘিতে লাইনচ্যুত হয়েছে। আজ বুধবার বিকেলে দিকে উপজেলার শান্তাহার জংশনের অদূরে বাগবাড়ি এলাকায়ছবি : সোয়েল রানা

‎লোকোমাস্টার সংকেত অমান্য করার কারণে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার জংশনের অদূরে বাগবাড়ি এলাকায় নীলসাগর এক্সপ্রেসের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। আজ বুধবার বেলা আড়াইটার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের আদমদীঘি স্টেশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাঁরা এখন পর্যন্ত আহত ৪৮ জনকে উদ্ধার করেছেন। আর রেলপথ মন্ত্রণালয় বলছে, আহত মানুষের সংখ্যা ৬৬।

ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আহাম্মেদ হোসেন মাসুম। দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনটি উদ্ধারে পার্বতীপুর ও ঈশ্বরদী থেকে দুটি উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে এসেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী ও দুর্ঘটনাকবলিত যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাগবাড়ি এলাকায় রেললাইন মেরামতের কাজ চলছিল। ওই স্থানে লাল নিশানা টাঙানো ছিল। ঢাকা থেকে নীলফামারীগামী আন্তনগর নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঈদে ঘরমুখী যাত্রীতে ভরা ছিল। ট্রেনটি সান্তাহার জংশনে যাত্রাবিরতির পর আক্কেলপুর রেলস্টেশনের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। সান্তাহার জংশনের দুই কিলোমিটার উত্তরের বাগবাড়িতে এসে ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়। এ সময় ট্রেনের ছাদে থাকা যাত্রীরা নিচে পড়ে আহত হন। এ ছাড়া বগির ভেতরে থাকা অনেক যাত্রীও আহত হন।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট এসে আহত ৪৮ যাত্রীকে উদ্ধার করেছে। দুর্ঘটনার পর ঈদে ঘরমুখী ট্রেনযাত্রীরা চরম বিড়ম্বনায় পড়েছেন। তাঁরা বিভিন্ন যানবাহনে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেন।

আজ ‎বুধবার বিকেল চারটায় দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ট্রেনটির ৯টি বগির লাইনচ্যুত হয়ে আছে। কয়েকটি বগির চাকা লাইন ছেড়ে পাথরের ওপর। ট্রেনটি কয়েকটি বগি আঁকাবাঁকা হয়ে রয়েছে। রেললাইন উপড়ে গেছে।

বাগবাড়ি গ্রামের সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি দুপুরে বাড়ির বাইরে কাজ করছিলাম। এমন সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। ট্রেনের ছাদে থাকা লোকজনের কারও হাত ভেঙেছে, কারও মাথা কেটেছে।’ বাগবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ছামাদ বলেন, বাগবাড়িতে রেললাইনের মেরামতের কাজ চলছিল। সকাল থেকে সব ট্রেন এখানে দাঁড়িয়েছে। এরপর গতি কমিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান অতিক্রম করেছে। নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি লাল নিশানা উড়িয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান অতিক্রম করতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

সান্তাহার রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার খাদিজা খাতুন বলেন, রেললাইনে আগে থেকেই ত্রুটি ছিল। বেলা আড়াইটার দিকে সান্তাহার প্ল্যাটফর্মের অদূরে ট্রেনটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে এবং ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়। এ রুটে আপাতত ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। দুটি রিলিফ ট্রেন এসেছে।

আরও পড়ুন

রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আহাম্মেদ হোসেন মাসুম বলেন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে কার দোষ, সেটি নিশ্চিত হওয়া যাবে। দ্রুত মেরামত করে রেললাইন সচল করা হবে। আজ রাতের মধ্যে কাজ শুরু হবে।

এদিকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, বুধবার ট্রেনটি ঢাকা থেকে চিলাহাটির উদ্দেশে সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে যায়। সান্তাহার স্টেশন পার হয়ে তিলকপুর স্টেশনের দিকে যাওয়ার সময় ব্যানার সিগন্যাল অনুসরণ না করায় বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার বাগমারী এলাকায় ৯টি কোচ লাইনচ্যুত হয়। এতে আহত হন ৬৬ জন। এর মধ্যে নওগাঁ সদর হাসপাতালে ২০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন, ৪০ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং ৬ জনকে বগুড়া আদমদীঘি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ায় উত্তরবঙ্গের ৫ জেলা নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও জয়পুরহাটের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে
ছবি : প্রথম আলো

তিনটি স্টেশনে আটকা ৫টি ট্রেন
সান্তাহারে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হওয়ায় তিনটি স্টেশনে ঈদযাত্রার ৫টি ট্রেন আটকা পড়েছে। রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, রাত দুইটা নাগাদ লাইনচ্যুত ট্রেনটি উদ্ধার হবে। এতে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের আরও কয়েক জোড়া ট্রেন আটকা পড়তে পারে। ঘটনার পর উত্তরবঙ্গের ৫ জেলা নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও জয়পুরহাটের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় রেল কন্ট্রোলার শফিকুর রহমান জানান, ঘটনার পর থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ঈদযাত্রার তিনটি ট্রেন আটকা পড়েছে। এর মধ্যে পঞ্চগড় থেকে রাজশাহীগামী বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে, খুলনা থেকে চিলাহাটিগামী রূপসা এক্সপ্রেস নাটোরের রানীনগরে, খুলনা থেকে পার্বতীপুরগামী রকেট মেইল নাটোরে, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা পঞ্চগড়গামী একতা এক্সপ্রেস নাটোরের আবদুলপুর স্টেশনে ও রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা চিলাহাটিগামী বরেন্দ্র এক্সপ্রেস আবদুলপুর স্টেশনে আটকে আছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় প্রকৌশলী নাজিব কায়সার বলেন, লাইনচ্যুত ট্রেনটি উদ্ধার করতে রাত দুইটা বাজতে পারে। এতে আরও কয়েক জোড়া ট্রেন আটকা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে দ্রুত লাইন চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে।