ময়মনসিংহে সারের ডিলার নিয়োগ নিয়ে বিএনপির নেতারাই প্রশ্ন তুলছেন

ময়মনসিংহের ফুলপুরে সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ এনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছে। গত শনিবার উপজেলা পরিষদেছবি: প্রথম আলো

ময়মনসিংহে সারের ডিলার নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন একজন সংসদ সদস্যের ভাই ও মামা। এ ছাড়া ধান-চালের ব্যবসায়ী ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালের ডিলারও সারের ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সংসদ সদস্য ও নেতারা।

জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সারের ডিলার নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে গত কয়েক দিনে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন হয়েছে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ ৯ অক্টোবর নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ার কিছু ইউনিয়নসহ বিভিন্ন উপজেলার কিছু ইউনিয়নে ফ্যাসিস্টের দোসরদের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফ্যাসিস্টের দোসরদের নাম স্থানীয় প্রশাসন ১ নম্বর ক্রমিকে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। আমি কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল পর্যায়ে কথা বলে জেনেছি, স্থানীয় প্রশাসন যাদের নাম ১ নম্বর ক্রমিকে পাঠিয়েছে, মন্ত্রণালয় নীতিগতভাবে তাদেরই ডিলার নিয়োগ দিয়েছে। কোন প্রক্রিয়ায় তাদের নাম ১ নম্বরে গেল?’

অনিয়মের পাশাপাশি সংসদ সদস্যের ভাই ও স্বজনের ডিলারশিপ পাওয়া প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ গতকাল সোমবার রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, সংসদ সদস্যের আত্মীয়স্বজন হলেই তাঁরা ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ পাবেন না, এমন নয়। তাঁরা যোগ্য হলে এবং তাঁদের চেয়ে যোগ্য কেউ না থাকলে বিষয়টি ভিন্ন। যদি এর ব্যত্যয় হয় তাহলে সেটি অবশ্যই বিবেচনা করা হবে। তিন মাস পর তো পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় এই নেতা বলেন, ‘সারের ডিলার নিয়োগে যেখানে যেখানে অনিয়ম হয়েছে, সেখানে আমরা আহ্বান জানিয়েছি তদন্তপূর্বক পুনর্বিবেচনার জন্য। আমি শুনেছি সরকার সে ব্যাপারে তদন্ত করছে।’

ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ আগস্ট জেলার ১৪টি উপজেলার ১৪৫টি ইউনিয়নে ১৫৬ জন সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এ জন্য আবেদন জমা পড়ে ১ হাজার ৭৪৪টি। যাচাই-বাছাই শেষে ৯ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকার সার ডিলারদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশ এবং সারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে তালিকাটি চূড়ান্ত করা হয়। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের ডিলারশিপ প্রথমে অস্থায়ীভাবে দেওয়া হয়েছে। তিন মাস পর্যবেক্ষণের পর সন্তোষজনক বিবেচিত হলে তা স্থায়ী করার কথা রয়েছে।

সংসদ সদস্যের আত্মীয়স্বজন হলেই তাঁরা ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ পাবেন না, এমন নয়। তাঁরা যোগ্য হলে এবং তাঁদের চেয়ে যোগ্য কেউ না থাকলে বিষয়টি ভিন্ন। যদি এর ব্যত্যয় হয় তাহলে সেটি অবশ্যই বিবেচনা করা হবে। তিন মাস পর তো পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
সৈয়দ এমরান সালেহ, বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব

তালিকা প্রকাশের পরই বিভিন্ন এলাকায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ ৯ অক্টোবর নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া একটি পোস্টে ডিলার নিয়োগে প্রশাসনের একাংশের বিরুদ্ধে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তোলেন। তিনি লেখেন, ‘কে কোথা থেকে কত পারসেন্ট টাকা নেয়, তা আমি জানি।’

রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা মামলা-হামলার শিকার হবে, আর অর্থের বিনিময়ে সার ডিলারশিপ দেওয়া হবে—এমনটা হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এমপির ভাই ও মামা পেলেন ডিলারশিপ

ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামানের ভাই ও মামা সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন। তালিকা অনুযায়ী গফরগাঁওয়ের লংগাইর ইউনিয়নে মেসার্স এসএম এন্টারপ্রাইজের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন মো. মনিরুজ্জামান। তিনি সংসদ সদস্যের ছোট ভাই এবং দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক।

উস্থি ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন সংসদ সদস্যের মামা মো. মনিরুজ্জামান। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম জাহিদুল স্যানিটারি অ্যান্ড হার্ডওয়্যার। অন্যদিকে যশরা ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছে সেলিম ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. সোহেল রানা গফরগাঁও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব। স্থানীয়ভাবে তিনি সংসদ সদস্যের চাচাতো শ্যালক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিজের ভাই ও স্বজনেরা ডিলারশিপ কীভাবে পেলেন এমন প্রশ্নে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজনৈতিক ত্যাগ, ব্যবসায়িক যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও গোডাউন করার সক্ষমতা যাচাই করে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমার কোনো চাচাতো শ্যালক নেই। ভাই ও মামা তাঁদের যোগ্যতায় পেয়েছেন। সবচেয়ে নির্যাতিত লোকদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে, যারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তারা সুবিধাবাদী।’

খুচরা ডিলার ও ধান ব্যবসায়ীর নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন

হালুয়াঘাট উপজেলার শাকুয়াই বাজারে মেসার্স সালমান ইসলামীয়া স্টোরকে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হোসাইন আহম্মদ সালমান আগে খুচরা সার ডিলার ছিলেন। অবৈধভাবে সার বিক্রির অভিযোগও আছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।

হোসাইন আহম্মদ সালমান বলেন, নতুন ডিলার নিয়োগের জন্য আবেদন করার পর কর্তৃপক্ষ তাঁকে যোগ্য মনে করায় নিয়োগ পেয়েছেন। নতুন ডিলারশিপ পাওয়ার আগে খুচরা ডিলারশিপ প্রত্যাহার করে টাকা তুলে নিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে হালুয়াঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ওই খুচরা ডিলারের ডিলারশিপ বাতিল হয়নি। প্রত্যাহারের কোনো আবেদনও তাঁর কাছে জমা পড়েনি। খুচরা ডিলার থাকা অবস্থায় কীভাবে নতুন করে ডিলারশিপ পেয়েছেন, তা জেলা কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে।

রাজনৈতিক ত্যাগ, ব্যবসায়িক যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও গোডাউন করার সক্ষমতা যাচাই করে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমার কোনো চাচাতো শ্যালক নেই। ভাই ও মামা তাঁদের যোগ্যতায় পেয়েছেন। সবচেয়ে নির্যাতিত লোকদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে, যারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তারা সুবিধাবাদী।
মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান, সংসদ সদস্য, ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও)

ফুলপুরের ভাইটকান্দি ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মেসার্স সাদিকা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালের ডিলার এবং ধান-চালের ব্যবসায়ী।

ভাইটকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুর রহমান বলেন, প্রকৃত সার ব্যবসায়ী না হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে সাখাওয়াত হোসেনকে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হলো, তা প্রশাসনের কাছে জানতে চান তাঁরা।

তবে নীতিমালা অনুযায়ী ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে দাবি করেন সাখাওয়াত হোসেন। সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, ফুলপুরসহ বিভিন্ন উপজেলায় গত কয়েক দিনে একাধিকবার সংবাদ সম্মেলন করেছেন নিয়োগ না পাওয়া আবেদনকারী ও বিএনপি নেতারা। ডিলার নিয়োগে ‘অলিখিত বাণিজ্য’ হয়েছে বলে তাঁদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন।

অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা

নীতিমালার বাইরে কাউকে নিয়োগের জন্য বিবেচনা করা হয়েছে—এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান।

সংসদ সদস্যের স্বজনদের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়ে জেলা প্রশাসক প্রথম আলোকে বলেন, কে কার আত্মীয়, সেটি বিবেচ্য নয়; নীতিমালায় নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড অনুসরণ করেই প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। গড়ে প্রতিটি ইউনিয়নে ১২ থেকে ১৩ জন ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু জেলা কমিটির সুপারিশ করার সুযোগ ছিল একজনের জন্য। এ কারণে অন্য আবেদনকারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। নীতিমালা অনুসরণ করেই ডিলার নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।