‘মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানলে তরুণ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হবে না’
‘অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, অসংখ্য মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষা, অসংখ্য মানুষের সংগ্রাম-লড়াইয়ের মিলিত ফল আমাদের স্বাধীনতা। এটা আমাদের সবার মনে রাখতে হবে। তাই কাউকে খাটো করার দরকার নেই। আবার কাউকে প্রয়োজনের চেয়ে অত বেশি বড় করার দরকারও নেই। স্বাধীনতার লড়াইয়ে যাঁর যা প্রাপ্য, সে সম্মান ও স্থান তাঁকে দিতে হবে।’
চট্টগ্রামে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড-২০২৬’ অনুষ্ঠানে অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি, সাংবাদিক ও লেখক আবুল মোমেন। আজ শনিবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের ২ নম্বর গেটের পূর্ব নাসিরাবাদ এ জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মিলনায়তনে এ অলিম্পিয়াডের আয়োজন করে বন্ধুসভা।
‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, চেতনা ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে মার্চ মাসজুড়ে দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডের আয়োজন করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বাধীনতাসংগ্রামের পক্ষে দেশ-বিদেশের বন্ধুদের ভূমিকা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা এবং শহীদদের আত্মত্যাগ নিয়ে কথা বলেন।
অতিথির বক্তব্যে কবি আবুল মোমেন বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা এক দিনে হঠাৎ করে হয়নি। গাছের যেমন শিকড় রয়েছে, তেমনি স্বাধীনতারও একটি শিকড় আছে। স্বাধীনতার আগে তিনটি বড় ঘটনা তরুণ প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে। এগুলো হচ্ছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন; ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন এবং ১৯৬৯–এর গণ-অভ্যুত্থান। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েছিল; কিন্তু পাকিস্তানি গোষ্ঠী তা মানল না। তারা বাঙালিকে ক্ষমতা দেবে না। এর থেকেই একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো।’
মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছে উল্লেখ করে লেখক আবুল মোমেন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটা ফ্রন্টে হয়নি, অনেকগুলো ফ্রন্ট ছিল। দেশ-বিদেশের অনেকেই যে যার অবস্থান থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। বিশ্বদরবারে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা বন্ধের কথা বলেছেন। সবকিছুর মিলিত ফল হচ্ছে এ বিজয়। তাই তাঁদের এই ত্যাগ সবার মনে রাখতে হবে।’
চট্টগ্রাম বন্ধুসভার উপদেষ্টা শিহাব জিশানের সভাপতিত্বে ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক কবি ও সাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী। অনুষ্ঠানের সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক ইরফাতুর রহমান, সহসভাপতি ইব্রাহিম তানভীর ও মো. নুরুজ্জামান খান, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক আফিফ ইব্রাহীম, দপ্তর সম্পাদক জয় চক্রবর্তী, বইমেলা সম্পাদক সামিয়া সুলতানা নাদিরা প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে কবি বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, ‘একটি মানচিত্র, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা অর্জনে অনেক রক্ত দিতে হয়েছে। স্বাধীনতা নিয়ে এখনো নানা রকমের বিভ্রান্তি রয়েছে, নানা বিকৃতি রয়েছে। এখন এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড আয়োজনের তাৎপর্য রয়েছে। যাতে স্বাধীনতা নিয়ে নানা রকমের বিভ্রান্তি ও বিকৃতি রোধ করা যায়। এর মাধ্যমে শিশু-কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানা থাকলে তরুণ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হবে না।’
গণিত উৎসব, ভাষা প্রতিযোগসহ প্রথম আলোর বিভিন্ন আয়োজনের কথা উল্লেখ করে বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, ‘প্রথম আলো বিভিন্ন উদ্যোগ আয়োজন করে সমাজটাকে একটা সচল-সজীব সমাজে পরিণত করতে চায়। তরুণদের জন্য যেমন নানা উৎসবের আয়োজন করে, তেমনি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্মানিত করে। কারণ, সব মিলিয়ে যদি একটা সমাজ এগিয়ে না যায়, তাহলে এই সমাজে বসবাস করা আসলে কঠিন।’
অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন চট্টগ্রাম বন্ধুসভার সদস্যরা। এ ছাড়া সাংস্কৃতিক পর্বে গান ও নৃত্য পরিবেশন করেন বন্ধুসভার সদস্যরা। প্রথম পর্বে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৮৯ শিক্ষার্থী অংশ নেন। উত্তরপত্র মূল্যায়নের মাধ্যমে ৬ জনকে বিজয়ী নির্বাচিত করা হয়। প্রথম হয়েছে ভাটিয়ারি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী দেবরাজ মজুমদার, দ্বিতীয় হয়েছে ইস্পাহানী পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের মো. ইনজামুল করিম, তৃতীয় হয়েছে কলেজিয়েট স্কুলের আরেফিন আফরোজ, চতুর্থ হয়েছেন আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের ছাত্র সাকিব জিশান ও পঞ্চম হয়েছে সিএমপি কলেজের অর্গজিৎ বড়ুয়া। বিশেষ পুরস্কার পেয়েছেন চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী আইরিন আকতার। অনুষ্ঠানে অতিথিরা বিজয়ীদের হাতে উপহার হিসেবে বই তুলে দেন।