‘শিক্ষার্থীদের নিয়ে এমন অনুষ্ঠান আগে কখনো দেখিনি’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শিখো–প্রথম আলো কৃতী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করছেন বন্ধুসভার সদস্যরা। শুক্রবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণেছবি: প্রথম আলো

‘আমার মা-বাবা নিরক্ষর, পড়াশোনা জানেন না। তাঁদের সেই সক্ষমতা ছিল না যে আমাকে পড়িয়ে পড়া আদায় করবেন। কিন্তু আমি যখন রাত জেগে পড়াশোনা করতাম, তাঁরা আমার পাশে বসে থাকতেন। আমি এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁদের সম্মান করছি, তাঁদের স্মরণ করছি। প্রথম আলোর এই অনুষ্ঠান শুধু সংবর্ধনা নয়, আমাদের দায়িত্বশীল করে দিয়েছে। আমাদের আরও বড় হতে হবে।’

আজ শুক্রবার সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজে অনুষ্ঠিত শিখো–প্রথম আলো জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এভাবেই নিজের অনুভূতির কথা তুলে ধরে কৃতী শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম। চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় সরাইল উপজেলার শাহাজাদাপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।

প্রথম আলোর আয়োজনে এবং শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় সারা দেশে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে ৬৪ জেলায় ‘জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা ২০২৬’ আয়োজন করা হচ্ছে। ‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্ব আজ অনুষ্ঠিত হয়।

আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। সহযোগিতায় রয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।

সকাল থেকেই কৃতী শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজ চত্বর। তাদের সঙ্গে অনেক অভিভাবকও অনুষ্ঠানে আসেন। কেউ ফটো ফ্রেমে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে, কেউ প্রথম আলো এক্সপেরিয়েন্স জোনে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। পুরস্কার পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায় অনেক শিক্ষার্থীকে।
সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রথম আলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভার সদস্যরা জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। তাঁদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান সহস্রাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক।

জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন অতিথিসহ শিক্ষার্থীরা
ছবি: প্রথম আলো

অর্জন ধরে রাখার আহ্বান

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, রাষ্ট্র শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক কিছু করেছে। রাষ্ট্রের প্রতিও তাঁদের দায়িত্ব রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের পথচলা শুরু হয়েছে। এই অর্জন ধরে রাখতে হবে। এসএসসির মতো এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পেলে সাফল্য সার্থক হবে।

শিক্ষার্থীদের স্বপ্নবান হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনাইটেড কলেজের উদ্যোক্তা পরিচালক ও ইংরেজির শিক্ষক শাহীন মৃধা বলেন, স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে অনেক দূর যেতে হবে। স্বপ্নহীন জীবন ডানা ভাঙা পাখির মতো। সক্ষমতার সীমানা ভাঙতে জানতে হবে।

অনুষ্ঠানে স্টল থেকে ক্রেস্টসহ উপহারসামগ্রী নিতে শিক্ষার্থীদের ভিড়
ছবি: প্রথম আলো

সাফল্যের পেছনে মা-বাবা ও শিক্ষক

জেলা শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের নবীনগর উপজেলা থেকে সকাল আটটায় খালার সঙ্গে অনুষ্ঠানের উদ্দেশে রওনা হয় নবীনগর ইচ্ছামতী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া ইসলাম। সকাল ১০টায় অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছায় সে। সাদিয়া বলে, ‘অনেক পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছি। আমি মাঝেমধ্যে প্রথম আলো পত্রিকা পড়ি।’

নিজের সাফল্যের পেছনে মা–বাবা ও শিক্ষকদের ভূমিকাকে স্মরণ করে কৃতী শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলে, জিপিএ-৫ পাওয়াই শেষ অধ্যায় নয়; ভালো মানুষ হতে হবে।

বাবা টুটুল পাল চৌধুরীর সঙ্গে অনুষ্ঠানে আসে সূর্যমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া অনিন্দিতা পাল চৌধুরী। মেয়ের ছবি তুলে দিতে দেখা যায় টুটুল পাল চৌধুরীকে। তিনি বলেন, প্রথম আলোর প্রতিটি কাজই শিক্ষামূলক। তাই মেয়ের সঙ্গে এসেছেন।

অনুষ্ঠানের ফাঁকে কবিতা আবৃত্তি, সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করা হয়
ছবি: প্রথম আলো

বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, আনন্দ-আড্ডা

জিপিএ-৫ পাওয়া তাশফিয়া তাসনিম, সৈয়দা কানিজ জাহান, ইসরাত জাহান, লামিয়া আমান্তু রহমান, মহুনা রায় ও তানহা আক্তার একে অপরের বন্ধু। তারা সবাই জেলা শহরের গভ. মডেল গার্লস হাইস্কুল থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে এবং বিভিন্ন কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছে। অনেক দিন পর একসঙ্গে হয়ে তারা অনুষ্ঠানস্থলে আনন্দে মেতে ওঠে।

তাশফিয়া তাসনিম বলে, ‘প্রতিটি আয়োজন ছিল উপভোগ করার মতো। আমরা অনেক খুশি। শিক্ষার্থীদের নিয়ে এমন অনুষ্ঠান আগে কখনো দেখিনি।’

ছবি তোলায় ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা

মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে ‘না’

অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে ‘না’ বলার শপথ পড়ান প্রথম আলোর হেড অব কালচারাল এন্টারটেইনমেন্ট কবির বকুল। তিনি বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি দেশের জন্য কাজ করতে হবে এবং ভালো মানুষ হতে হবে। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়াকে জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য মনে করলে চলবে না। আরও বেশি পড়াশোনা করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।

পরে বিভিন্ন স্টলে ভিড় করেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। কেউ কুইজে অংশ নেন, কেউ প্রথম আলোর চরকি ঘুরিয়ে পুরস্কার জেতেন। অনুষ্ঠানের ফাঁকে কবিতা আবৃত্তি, সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করা হয়। পরে কুইজ বিজয়ী ১০ শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন আমন্ত্রিত অতিথিরা।