ইকোপার্ক নিয়ে আশার সঙ্গে আছে আশঙ্কাও
বন ও বন্য প্রাণী রক্ষার আশা যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও উচ্ছেদ নিয়েও দেখা দিয়েছে আশঙ্কা।
একসময় প্রায় সাড়ে তিন হাজার একরজুড়ে ছিল শাল-গজারির বন। বুনো শূকর, মেছো বাঘ, হনুমানসহ নানা বন্য প্রাণীর বিচরণ ছিল সেখানে। সময়ের সঙ্গে বন কমেছে, বেড়েছে মানুষের বসতি ও চাষাবাদ।
এই পরিস্থিতি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার সন্তোষপুর বনাঞ্চলের। এখন সেখানে প্রাকৃতিক শালবন টিকে আছে মাত্র ৫০ একর। সেই বনভূমির ৫৬৫ একর জায়গায় ইকোপার্ক ঘোষণা করেছে সরকার। এতে বন ও বন্য প্রাণী রক্ষার আশা যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও উচ্ছেদ নিয়েও দেখা দিয়েছে আশঙ্কা।
৩ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী সন্তোষপুর মৌজার ওই বনভূমিকে ইকোপার্ক ঘোষণা করা হয়। উদ্দেশ্য, বৃক্ষসম্পদ ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, জনসাধারণের বিনোদন এবং শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি করা।
৪০ বছর মেয়াদে সরকার আমাদের অংশীদার করেছে। গাছ দেখাশোনার পাশাপাশি বনে চাষাবাদ করে সংসার চালাই। ইকোপার্কের হলে এই ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায় কি–না দুশ্চিন্তায় আছি।সুলেমান মিয়া, স্থানীয় কৃষক
আগের বন নেই
ফুলবাড়িয়ার নাওগাঁও ইউনিয়নের সন্তোষপুর, কৃষ্ণপুর ও রাঙ্গামাটিয়া—এই তিন মৌজায় বনভূমির পরিমাণ ৩ হাজার ৬৫৯ দশমিক ১৪ একর। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একসময় এর বড় অংশজুড়ে ছিল প্রাকৃতিক শাল-গজারির বন। কমতে কমতে এখন প্রাকৃতিক শালবন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ একরে। বাকি এলাকায় বন বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় কৃষি ও সামাজিক বনায়ন হয়েছে। প্রায় ১ হাজার ৩৬১ একর জমি রাবারবাগানের জন্য বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে রাবারবাগান রয়েছে প্রায় ৭০০ একর এলাকায়। সুফল প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭০০ একর জমিতে বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছের বাগান করা হয়েছে। আগরবাগান রয়েছে প্রায় ৪০ একর এলাকায়। বাকি অংশে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক বনায়ন রয়েছে।
বন বিভাগ জানায়, ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে কৃষি বনায়ন এবং ২০০০ সালের শুরুর দিকে সামাজিক বনায়নের কার্যক্রম শুরু হয়। এসব কার্যক্রমে স্থানীয় মানুষকে অংশীদার করা হয়। সামাজিক বনায়নের বড় একটি অংশে আকাশমণিগাছ লাগানো হয়েছে। সন্তোষপুর বিটের ডেপুটি রেঞ্জার ও বিট কর্মকর্তা মোহাম্মদ এমদাদুল হক বলেন, প্রাকৃতিক বনে শালগাছ বা শালের চারা থাকলে সেখানে বাগান করা হয়নি। আগে থেকেই নষ্ট বা দখল হয়ে যাওয়া এলাকায় পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বনায়ন করা হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, একসময় সন্তোষপুরে প্রায় ১৫০ একর বনভূমি জবরদখলে ছিল। গত দুই বছরে ১১২ একর জমি দখলমুক্ত করে সেখানে সামাজিক বনায়ন করা হয়েছে। গাছ কাটা ও বনভূমি দখলের অভিযোগে ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে চলতি আগস্ট পর্যন্ত ৪২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে গত দুই বছরেই হয়েছে ৩৪টি।
উচ্ছেদ হওয়ার শঙ্কায় কৃষকরা
ইকোপার্ক ঘোষণার পর বনাঞ্চলের সামাজিক বনায়নের অংশীদার ও স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে উচ্ছেদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাঁদের কেউ দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক বনায়নের আওতায় থাকা জমিতে চাষ করছেন। কেউ আবার বনভূমির ভেতরে বসবাস করছেন।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সন্তোষপুর বনাঞ্চলের বিভিন্ন সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমে প্রায় দেড় হাজার মানুষ অংশীদার হিসেবে যুক্ত।
সুলেমান মিয়া বন বিভাগের জমিতে আনারস ও হলুদ চাষ করেন। তিনি বলেন, ‘৪০ বছর মেয়াদে সরকার আমাদের অংশীদার করেছে। গাছ দেখাশোনার পাশাপাশি বনে চাষাবাদ করে সংসার চালাই। ইকোপার্কের হলে এই ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায় কি–না দুশ্চিন্তায় আছি।’
সন্তোষপুর বনাঞ্চলে আনারস, হলুদ, কলা, লেবুসহ বিভিন্ন ফসল চাষ হয়। এসব কৃষিপণ্য থেকে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হয় বলে দাবি ফুলবাড়িয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদের। তাঁর পরামর্শ, কৃষিকে বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা করা হলে স্থানীয় মানুষের জীবিকা রক্ষা করা সম্ভব হবে। কৃষিকে টিকিয়ে রেখে ইকোপার্ক করা হলে সেটি বেশি কার্যকর হবে।
সামাজিক বনায়নে যুক্ত ব্যক্তিদের আতঙ্কিত না হতে পরামর্শ দিয়েছেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ নূরুল করিম। তিনি বলেন, ‘সামাজিক বনায়নে স্থানীয় মানুষকে অংশীদার করা হয়েছে। তাঁদেকে সঙ্গে নিয়েই উন্নয়নমূলক কাজ করা হবে।
বন সঙ্কুচিত হওয়ায় অনেক প্রাণী হারিয়ে গেছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ষাটোর্ধ্ব গৌরাঙ্গ চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘বুনো শূকর, শিয়াল, বানর, হনুমান দেখেছি। বাঘ থাকার কথাও শুনেছি। এখন কিছু শিয়াল আর বানর ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়েই এবং তাঁদের অধিকার সংরক্ষণ করেই ইকোপার্ক বাস্তবায়ন করা হবে। তাঁদের ক্ষতি হবে—এমন প্রচার সঠিক নয়।মো. কামরুল হাসান, সংসদ সদস্য
হবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন
ইকোপার্ক হলে দর্শনার্থী টানতে নানা স্থাপনা নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ নূরুল করিম। এ জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির প্রস্তুতি চলছে।
নূরুল করিম বলেন, ইকোপার্কে সীমানাপ্রাচীর, প্রধান ফটক, টিকিট কাউন্টার, পার্ক কার্যালয়, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, দর্শনার্থী শেড, বসার বেঞ্চ, তথ্যকেন্দ্র, শৌচাগার, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, নামাজের স্থান, হাঁটার পথ, লেক খনন ও নৌবিহারের মতো অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
ইকোপার্ক হলে স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষই বেশি উপকৃত হবেন বলে জানান স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. কামরুল হাসান। তিনি বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়েই এবং তাঁদের অধিকার সংরক্ষণ করেই ইকোপার্ক বাস্তবায়ন করা হবে। তাঁদের ক্ষতি হবে—এমন প্রচার সঠিক নয়।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স সেলের (আইকিউএসি) অতিরিক্ত পরিচালক এম এ ফারুকের সঙ্গে। সন্তোষপুরে ইকোপার্ক হওয়া ভালো উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তবে এটি যেন শুধু পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত না হয়, সেটি নিশ্চিত করার পরামর্শও দিয়েছেন এই অধ্যাপক।