বিল নিয়ে সমঝোতার পরও কাটেনি দুই নেতার বিরোধ, অস্বস্তিতে অষ্টগ্রাম বিএনপি
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে বিল মাকশার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাঈদ আহমেদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম শাহিনের বিরোধে দলের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের মধ্যস্থতায় বিলের নিয়ন্ত্রণ ভাগাভাগির সিদ্ধান্ত হয়। তবে সমঝোতার পরও দুই নেতার দূরত্ব কমেনি। দলীয় সভা, কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমেও গতি ফেরেনি।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর বিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আহত হন। পুলিশ দুই পক্ষের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে শতাধিক বল্লমসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে। তবে এ ঘটনায় কেউ আটক হননি, মামলাও হয়নি। পরদিন জেলা বিএনপি সাঈদ আহমেদকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। পরে তাঁর জবাব সন্তোষজনক বিবেচিত হওয়ায় নোটিশ প্রত্যাহার করা হয়।
দলীয় নেতা-কর্মীরা বলেন, সমঝোতার পরও দুই নেতা একসঙ্গে বসেননি। তাঁদের মধ্যে ফোনে যোগাযোগও নেই। কেউ কেউ এক পক্ষ ছেড়ে অন্য পক্ষে যোগ দিচ্ছেন। এতে দলীয় শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন তাঁরা।
অষ্টগ্রাম উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিন আশরাফী কোনো পক্ষে নেই। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সংসদ সদস্য সমঝোতা করে দিলেও দুই নেতার মধ্যে মনের মিল হয়েছে বলে মনে হয় না। এতে সাধারণ মানুষের কাছে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দলীয় আদর্শ ধরে রাখার মধ্যেই এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ দেখেন তিনি।
যেভাবে বিরোধের শুরু
হাওরাঞ্চলের অষ্টগ্রামের অর্থনীতি কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ওপর নির্ভরশীল। উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ জলমহালগুলোর একটি বিল মাকশা। প্রতিবছর জেলা প্রশাসন থেকে বিলটি ইজারা দেওয়া হয়।
স্থানীয় লোকজন ও দলীয় নেতা-কর্মীদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিলটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সাঈদ আহমেদের পক্ষের লোকজনের হাতে। পরে শাহিন তাঁর খালাতো ভাই মো. জাহাঙ্গীর আলমের নামে ৫০ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকায় বিলটি এক বছরের জন্য ইজারা নেন। তবে ইজারা পেলেও তিনি নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেননি বলে অভিযোগ আছে। আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে ইজারামূল্য ফেরত চেয়ে হাইকোর্টে মামলা করেন শাহিন। মামলাটি এখনো চলছে।
দলীয় সূত্র বলছে, সমঝোতায় দুজনই ভেতরে–ভেতরে অসন্তুষ্ট ছিলেন। সাঈদ পক্ষের প্রত্যাশা ছিল, টাকা পরিশোধ না করেই বিলের অর্ধেকের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া। অন্যদিকে শাহিন চেয়েছিলেন, আগের বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিলের একক নিয়ন্ত্রণ।
এর পর থেকেই দুই নেতার বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। গত ২১ সেপ্টেম্বর নতুন ইজারার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর দুজনই অংশ নেন। শাহিন ৫০ লাখ ১৩ হাজার ৭৫০ টাকায় আবারও বিলটি ইজারা পান। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারাকে কেন্দ্র করে ২৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে পূর্ব অষ্টগ্রামের আখড়া বাজারে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়। প্রায় এক ঘণ্টা পর পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনার পর অষ্টগ্রামে বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতা ঝিমিয়ে পড়ে। স্থানীয় রাজনীতি হয়ে ওঠে দুই নেতাকেন্দ্রিক।
যে শর্তে সমঝোতা
৩০ সেপ্টেম্বর অষ্টগ্রাম উপজেলা মিলনায়তনে দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করেন সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান। সেখানে উপজেলা বিএনপির অধিকাংশ নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ বিরোধের কারণে দলীয় শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতার কথা তুলে ধরেন।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় আগের বছরের ইজারামূল্য বাবদ শাহিনকে ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করবেন সাঈদ আহমেদ। চলতি বছরের ইজারামূল্যের অর্ধেক দিয়ে বিলের অর্ধেক লাভ-ক্ষতির অংশীদার হবেন সাঈদ। উপস্থিত সবার সামনে দুই নেতাই এ সিদ্ধান্ত মেনে নেন।
দলীয় সূত্র বলছে, সমঝোতায় দুজনই ভেতরে–ভেতরে অসন্তুষ্ট ছিলেন। সাঈদ পক্ষের প্রত্যাশা ছিল, টাকা পরিশোধ না করেই বিলের অর্ধেকের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া। অন্যদিকে শাহিন চেয়েছিলেন, আগের বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিলের একক নিয়ন্ত্রণ। সমঝোতার পর শাহিন বিলের নিয়ন্ত্রণ নিলেও সাঈদ এখনো টাকা পরিশোধ করেননি, বিলেও যাচ্ছেন না। এতে নতুন করে বিরোধের আশঙ্কা করছেন নেতা-কর্মীরা।
দুই নেতার বিরোধে দলের ক্ষতি হচ্ছিল। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে শর্তসাপেক্ষে বিলের নিয়ন্ত্রণ ভাগ করে দিয়েছি। এখন সমস্যা থাকলে আবার আলোচনা করে সমাধান করা হবে। তবে ভবিষ্যতে এ নিয়ে নতুন কোনো ঘটনা ঘটলে ছাড় দেওয়া হবে না।
শাহিন প্রথম আলোকে বলেন, সংসদ সদস্যের সিদ্ধান্তের পর তিনি বিলে যাচ্ছেন, তবে এখনো টাকা পাননি। গত বুধবার সংসদ সদস্যের এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির মাধ্যমে সাঈদ তাঁকে জানিয়েছেন, তিনি (সাঈদ) বিলের অংশীদার হতে চান না। সমঝোতার পর দুই নেতার মধ্যে দেখাসাক্ষাৎ বা কথা হয়নি বলেও জানান শাহিন। বিরোধে দলের ক্ষতি হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, কমবেশি তো হচ্ছেই।
সংসদ সদস্যের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন বলে জানান সাঈদ আহমেদ। তিনি বলেন, বিলে তাঁর ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা বিনিয়োগ আছে। হিসাব-নিকাশ করে টাকা পরিশোধ করবেন, তবে বিলে যাবেন না। তাঁর ভাষ্য, অংশীদারত্বে আবার দ্বন্দ্ব হলে দলের ক্ষতি হবে। শাহিনের সঙ্গে বিরোধের কারণ শুধু বিল নয় বলেও দাবি করেন তিনি।
ক্ষতি হচ্ছে দলের
অষ্টগ্রাম উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. শাহ আলম বলেন, অষ্টগ্রামে আগে এ ধরনের সংঘাত হয়নি। দুই নেতার বিরোধে দলের অবস্থা ভালো নেই। তবে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশাবাদী।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, দুই নেতার বিরোধে দলীয় সভা, কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি ফেরানো যাচ্ছে না। তাঁর ভাষ্য, দলের বেশির ভাগ নেতা-কর্মী সুস্থ ধারার রাজনীতিতে আছেন। ছোট একটি অংশের মধ্যে ভোগ, দখল ও বিচারহীনতার প্রবণতা রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার অষ্টগ্রামে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গোল্ডকাপ ফুটবল খেলায় সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান প্রধান অতিথি ছিলেন। খেলা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ছিলেন শাহিন। দলীয় সূত্রের দাবি, সাঈদকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি অনুষ্ঠানে যাননি।
কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই নেতার বিরোধে দলের ক্ষতি হচ্ছিল। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে শর্তসাপেক্ষে বিলের নিয়ন্ত্রণ ভাগ করে দিয়েছি। এখন সমস্যা থাকলে আবার আলোচনা করে সমাধান করা হবে। তবে ভবিষ্যতে এ নিয়ে নতুন কোনো ঘটনা ঘটলে ছাড় দেওয়া হবে না।’
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, দুই জ্যেষ্ঠ নেতার দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ডে জেলা বিএনপি বিব্রত। এ নিয়ে আবার কোনো ঘটনা ঘটলে বহিষ্কারের মতো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।