ফরিদপুরে টানা দ্বিতীয় দিন চার গ্রামের মধ্যে সংঘর্ষ, পুলিশসহ আহত ২৮

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় দ্বিতীয় দিনের মতো চার গ্রামের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। আজ শনিবার সকাল ১০টার দিকে হামিরদী ইউনিয়নের মনসুরাবাদ বাজার এলাকায়ছবি: সংগৃহীত

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার হামিরদী ইউনিয়নে স্থানীয় আধিপত্যকে কেন্দ্র করে চার গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে দ্বিতীয় দিনের মতো সংঘর্ষ হয়েছে। এতে পুলিশ ও গ্রামবাসীসহ অন্তত ২৮ জন আহত হয়েছেন।

আহত পুলিশ সদস্যের নাম মো. মশিউর রহমান। তিনি ভাঙ্গা থানার কনস্টেবল পদে কর্মরত বলে নিশ্চিত করেছেন ভাঙ্গা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রেজওয়ান দিপু। তবে আহত অন্য ব্যক্তিদের নাম–পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

আজ শনিবার সকাল সোয়া সাতটায় শুরু হওয়া এ সংঘর্ষ চলে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভাঙ্গা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে পুলিশ সদস্যদের নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিতে দেখা যায়।

ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তানসিভ জুবায়ের জানান, সংঘর্ষে দুপুর একটা পর্যন্ত ২৮ জন আহত ব্যক্তি চিকিৎসা নিতে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে ১৮ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। গুরুতর আহত তিনজনকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বাকিদের জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

গতকাল শুক্রবারের সংঘর্ষের রেশ কাটতে না কাটতেই আজ সকালে সেখানে আবারও সংঘর্ষ শুরু হয়। এর আগে গতকাল বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সংঘর্ষ চলে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এর প্রায় ১২ ঘণ্টা পর আবার সংঘর্ষে জড়ায় দুটি পক্ষ।

আজ সকালে শুরুতে হামিরদী ইউনিয়নের মনসুরাবাদ গ্রামের বাজার এলাকায় দোকানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে এক পক্ষে মনসুরাবাদ গ্রামের লোকজন এবং অন্য পক্ষে একই ইউনিয়নের খাপুরা, মাঝিকান্দা ও সিঙ্গারিয়া গ্রামের বাসিন্দারা অংশ নেন।

সংঘর্ষে একাধিক পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে তাঁদের নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিতে দেখা যায়।
ছবি: প্রথম আলো

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আধিপত্য নিয়ে হামিরদী ইউনিয়নের খাপুরা, মাঝিকান্দা ও সিঙ্গারিয়া নামের তিনটি গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে মনসুরাবাদ গ্রামের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের বিরোধ আছে। তবে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। কেউ বলছেন, ফুটবল খেলা উপলক্ষে মাইকিংকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়; আবার কেউ বলছেন, ঈদের চাঁদরাতে মনসুরাবাদ বাজারে একটি দোকানের সামনে পটকা ফাটানো নিয়ে বিরোধের জেরেই সংঘর্ষের সূত্রপাত।

এ বিরোধের জেরে গতকাল বিকেল পাঁচটার দিকে খাপুরা গ্রামের এক ব্যক্তিকে মনসুরাবাদ বাজারে মারধর করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় এদিন বিকেল ও সন্ধ্যায় প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ চলে। পরে পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও আজ আবারও সংঘর্ষ হলো। প্রথমে সংঘর্ষ মনসুরাবাদ বাজার এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা ঢাকা–খুলনা মহাসড়কের মনসুরাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

সংঘর্ষে জড়িত পক্ষগুলো দেশি অস্ত্র ও ঢাল নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। মনসুরাবাদ গ্রামের লোকজন অবস্থান নেন বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। অন্যদিকে খাপুরা, মাঝিকান্দা ও সিঙ্গারিয়া গ্রামের বাসিন্দারা হামিরদী ইউনিয়ন পরিষদের সামনে জড়ো হন।

প্রায় পাঁচ ঘণ্টা উভয় পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা পুলিশের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এখনো থমথমে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মনসুরাবাদ গ্রামের বাসিন্দা পলাশ সাহা জানান, সংঘর্ষের প্রায় ৫ ঘন্টা পর দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে সেনাবাহিনী, র‍্যাব, ডিবি ও পলিশের অতিরিক্ত সদস্যরা এসে উভয়পক্ষকে হটিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

ভাঙ্গার হামিরদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. খোকন মিয়া বলেন, অন্য তিনটি গ্রামের তুলনায় মনসুরাবাদ গ্রামটি বড় ও জনসংখ্যাও বেশি। বাজারটি তিন গ্রামের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বাসস্ট্যান্ডটি মনসুরাবাদ গ্রামের দখলে রয়েছে। ছোটখাটো ঘটনা থেকে শুরু হয়ে এসব সংঘর্ষ পরে বড় আকার ধারণ করে। স্থানীয় আধিপত্যের কারণে তিনটি গ্রাম এক হয়ে মনসুরাবাদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়।

চেয়ারম্যান আরও বলেন, তরুণদের মধ্যে নানা ছোট বিষয় নিয়েই বিরোধের সূত্রপাত হয়—কখনো ইভটিজিং, কখনো খেলাধুলা, আবার কখনো মোটরসাইকেল চালানো নিয়ে। এসব ঘটনাই পরে সংঘর্ষে রূপ নেয়।

সংঘর্ষের পর মনসুরাবাদ বাজার এলাকার চিত্র। আজ দুপুরে তোলা
ছবি: প্রথম আলো

এ সংঘর্ষে পুলিশের তিন সদস্য আহত হয়েছেন জানিয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামছুল আজম বলেন, ‘সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে ডিবি ও থানা–পুলিশের দল ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সহায়তা চাওয়া হয়েছে।’