তিন দিন আগে মেয়ের বিয়ে দেন ফাহিমা আক্তার (৩৭)। আশুলিয়ার খেজুরবাগান এলাকায় ভাড়া বাসার ছাদে জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠান করেন। মেয়ের নতুন জীবন নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন তিনি। গতকাল সোমবার মেয়ে ও জামাতাকে আনতে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে যান ফাহিমাসহ পরিবারের বেশ কয়েকজন। একটি প্রাইভেট কারে নবদম্পতিকে নিয়ে আশুলিয়ায় ফিরছিলেন তাঁরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আশুলিয়ায় ফেরা হয়নি তাঁদের।
গতকাল বিকেলে উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের প্যারাডাইজ টাওয়ারের সামনের সড়কে চলন্ত অবস্থায় গাড়িটির ওপর বিআরটি প্রকল্পের ক্রেন থেকে গার্ডার পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই ফাহিমাসহ পাঁচজন মারা যান। ঘটনার পরপরই খবরটি আশুলিয়ার খেজুরবাগান এলাকায় পৌঁছালে ফাহিমার ভাড়া বাসার প্রতিবেশীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। ‘নবদম্পতির সুখের সংসার দেখার সুযোগ হলো না মায়ের’ মন্তব্য করে অনেককে অশ্রুসিক্ত হতে দেখা যায়। তাঁরা ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
ফাহিমার প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খেজুরবাগান এলাকায় আটতলা ভবনের ষষ্ঠ তলায় তিন কক্ষবিশিষ্ট ৬০৪ নম্বর ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন ফাহিমা ও তাঁর মেয়ে রিয়া মনি। বাকি কক্ষ দুটিতে আরও দুটি পরিবার থাকে। পোশাক কারখানায় কাজ করে মেয়েকে বিয়ে দিতে পেরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন ফাহিমা। মেয়ে রিয়াও একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। মেয়েকে বিয়ে দিয়ে বেশ হাসিখুশি ছিলেন তিনি। কিন্তু মেয়ের নতুন জীবনের সুখ দেখার সুযোগ পেলেন না তিনি। তার আগেই দুর্ঘটনা কেড়ে নিল তাঁর প্রাণ।
ফাহিমার ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে মাকে নিয়ে থাকেন মাবিজুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘খালাম্মা (ফাহিমা) আমাদের সবাইকে খুব আদর করতেন। কখনো ধমক পর্যন্ত দেননি। আপাও (রিয়া) খুবই ভালো মানুষ। যাদের কারণে এ ঘটনা ঘটছে, আমরা তাদের বিচার চাই।’
একই ভবনের পঞ্চম তলায় ভাড়া থাকেন নাসরিন বেগম। তিনি বলেন, মেয়েকে আনতে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার সময় ফাহিমা তাঁকেও যেতে বলেছিলেন। তিনি ব্যস্ততার কারণে যেতে পারেননি। সড়কে তাঁদের প্রাণ গেল। এটা খুবই কষ্টদায়ক। যাদের কারণে এ ঘটনা, তাদের কঠিন শাস্তি দাবি করেন তিনি।
প্রতিবেশী সালমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার কোটি কোটি টাকার কাজ করতেছে। এই কাজ করার সময় ব্যারিকেড দিয়া বোঝাইব না, ওই দিক দিয়া গেলে বিপদ হইতে পারে। একটা ভুলে পাঁচজন মানুষ মইরা গেল। এখন এর বিচার করব কে?’
ভবনের তত্ত্বাবধায়ক শফিকুল ইসলাম বলেন, এক বছর আগে মা-মেয়ে দুজনে মিলে ছয়তলার ৬০৪ নম্বর ফ্ল্যাটে একটি কক্ষ ভাড়া নেন। গত শনিবার ভবনের ছাদে রিয়ার বিয়ের আয়োজনের দায়িত্বটা তিনিই পালন করেছিলেন। বিয়ের পর গতকাল রিয়ার মা–সহ আত্মীয়রা মিষ্টি হাতে নিয়ে বউভাতের অনুষ্ঠানে যান। এরপরই বিকেলে দুর্ঘটনার খবর জানতে পারেন।
ফাহিমার ভাই মো. আফরান মণ্ডল বলেন, ‘দুলাভাই (ফাহিমার স্বামী) অসুস্থ। তিনি জামালপুরে থাকেন।’
লাশের ময়নাতদন্ত শেষ হলে ফাহিমাকে জামালপুরের টেঙ্গারগড় এবং ঝরনা ও ঝরনার দুই সন্তানকে একই জেলার মেলান্দহে দাফন করা হবে।