নেত্রকোনায় ধর্ষণের শিকার ১১ বছরের শিশু অন্তঃসত্ত্বা, মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা
নেত্রকোনার মদন উপজেলায় ১১ বছরের এক মাদ্রাসাছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ওই মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলাটি গত বৃহস্পতিবার করা হলেও ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
স্থানীয় বাসিন্দা, এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওই শিক্ষক চার বছর আগে একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। শিশুটি তার নানার বাড়িতে থেকে সেখানে লেখাপড়া করত। শিশুটির বাবা তার মাকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ায় জীবিকার তাগিদে মা সিলেটে একটি বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন।
মামলার অভিযোগ ও শিশুটির বরাত দিয়ে তার স্বজনেরা জানান, গত বছরের ২ নভেম্বর বিকেলে মাদ্রাসা ছুটির পর অভিযুক্ত শিক্ষক মেয়েটিকে ডেকে মাদ্রাসাসংলগ্ন মসজিদ ঝাড়ু দিতে বলেন। এ সময় মাদ্রাসার অন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বাড়ি চলে যান। ঝাড়ু শেষে একটি কক্ষে মেয়েটিকে ডেকে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণ করেন। এ ঘটনা কাউকে জানালে ওই শিশুকে এবং তাঁর মা ও ছোট ভাইদের মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। এভাবে একাধিকবার শিশুটিকে ধর্ষণ করেন।
সম্প্রতি শিশুটি অসুস্থ বোধ করছিল এবং তার মধ্যে শারীরিক পরিবর্তন দেখা যায়। পরে তার মা সিলেট থেকে এসে মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বিষয়টি জানতে পারেন। পরে ১৮ এপ্রিল শিশুটিকে মদন উপজেলা শহরে একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষা–নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসক জানান, শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা। পরে এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর মা বৃহস্পতিবার বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন।
শিশুটির স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন চিকিৎসক সায়মা আক্তার। তিনি বলেন, ‘শিশুটি মায়ের সঙ্গে ক্লিনিকে আসে। জানায়, তার পেট ভার ভার লাগে। কী যেন হঠাৎ করে নড়াচড়া করে। পরে পরীক্ষা করে দেখতে পাই, বাচ্চাটি প্রায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শিশুটিকে যখন বারবার জিজ্ঞাসা করি, “মা, তোমাকে এ কাজ কে করেছে?” তখন তার চোখেমুখে ভয়ের ছাপ। শুধু বলে, “হুজুর, হুজুর এই কাজ করেছে।”’
ওই চিকিৎসক জানান, ১১ বছর বয়সী মেয়েটির উচ্চতা সাড়ে চার ফুটের কম এবং ওজন মাত্র ২৯ কেজি। গর্ভস্থ ভ্রূণের বাইপ্যারাইটাল ডায়ামিটার (মাথার আকার) ৭৪ মিলিমিটার, যা শিশুটির পেলভিসের তুলনায় অনেক বড়। অর্থাৎ শিশুটির সরু কোমরের তুলনায় গর্ভস্থ বাচ্চার মাথার মাপ অনেক বেশি। এটি বড় ধরনের শারীরিক ঝুঁকি তৈরি করে। এ ছাড়া রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা মাত্র ৮ দশমিক ২। সরু পেলভিসের ভেতর দিয়ে বড় মাথার বাচ্চা প্রসব করা স্বাভাবিকভাবে সম্ভব নয়, যা মা ও বাচ্চা—উভয়ের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই ছোট বাচ্চার শরীরে সিজারিয়ান সেকশনের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যানেসথেসিয়া বা ওষুধের ডোজ নির্ধারণ করা চিকিৎসকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
শিশুটির মা আজ সোমবার সকালে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাকে আমার স্বামী ছেড়ে চলে গেছে। ছোট তিন ছেলে ও এক মেয়ে লইয়া খুব কষ্ট করি। জীবিকার তাগিদে সিলেটে মানুষের বাসায় কাম করি। মেয়েডারে আমার বাপের বাড়িতে রাইখ্যা কষ্ট কইরা মাদ্রাসায় লেখাপড়া করাতে দিছিলাম। কিন্তু হুজুর আমার এই শিশু বাচ্চাটার সঙ্গে এমন পিশাচের মতো কাজ করতে পারল, আমি কোনো দিন স্বপ্নেও ভাবিছিলাম না। এই ঘটনায় আমি তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত শিক্ষকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলে সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৮ এপ্রিল ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে আমান উল্লাহ স্ত্রী–সন্তানসহ বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।
মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এখানে দুই দিন হয় যোগ দিয়েছি। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এ ধরনের একটি মামলা করা হয়েছে। অভিযুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’