ভূমধ্যসাগরের সেই নৌকায় থাকা সুনামগঞ্জের আরেক তরুণের অনাহারে মৃত্যুর খবর

ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া সুনামগঞ্জ ছাতক উপজেলার ঘাগলাজুড় গ্রামের তরুণ মহিবুর রহমানছবি: পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া

ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের আরেক তরুণের মৃত্যুর খবর পেয়েছে তাঁর পরিবার। একই নৌকায় মারা যাওয়া সুনামগঞ্জের ১২ জনের সঙ্গে ওই তরুণও ছিলেন। মহিবুর রহমান (২০) নামের ওই তরুণের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তাঁর পরিবারে চলছে মাতম। ছেলের শোকে কাতর মা শয্যাশায়ী, ছোট ভাইকে ভর্তি করা হয়েছে হাসপাতালে।

মহিবুর রহমানের বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের ঘাগলাজুর গ্রামে। তাঁর বাবা মো. নুরুল আমিন, মা মহিমা বেগম। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে মহিবুর ছিলেন সবার বড়। দেশে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। তাঁর আয়েই চলত পুরো সংসার।

গত শনিবার ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারানো সুনামগঞ্জের ১২ জনের খবর দেশে আসার পর থেকেই মহিবুর রহমানের পরিবার বারবার দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু দালাল তাঁর ‘ভালো–মন্দ’ খবর নিশ্চিত করেনি। পরে সোমবার একই বোটে থাকা সুনামগঞ্জের আরেক যুবক মারুফ আহমদ গ্রিস থেকে মহিবুর রহমানের মৃত্যুর বিষয়টি তাঁর পরিবারকে নিশ্চিত করে। দেশ থেকে মহিবুর ও মারুফ আহমদ নামের ওই যুবক একই সঙ্গে গিয়েছিলেন। উদ্ধারের পর মারুফ আহমদ এখন গ্রিসের একটি ক্যাম্পে আছেন। মারুফ আহমদের ভাষ্য, বোটে অনাহারে দুর্বল হয়ে প্রথমেই মারা যান মহিবুর। এরপর একে একে অন্যদের মৃত্যু হয়।

মহিবুর রহমানের চাচাতো ভাই ভাতগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য মোহাম্মদ সুনু মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, মহিবুর চার মাস আগে গ্রিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন। এরপর সৌদি আরব হয়ে লিবিয়া যান। মাঝখানে তিনি খুব কষ্টে আছেন জানিয়ে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানিয়েছিলেন পরিবারের কাছে। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা এলাকার নবী হোসেনের মাধ্যমে তিনি গ্রিসে যেতে চেয়েছিলেন। নবী হোসেন লিবিয়া আছেন। দেশে নবী হোসেনের বাবা আবদুল মন্নান সব লেনদেন করেছেন। ছেলেকে গ্রিসে পাঠাতে দরিদ্র নুরুল আমিন জমি বিক্রি করেছেন, মহাজনি সুদে টাকা এনেছেন পাঁচ লাখ। মোট ১৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে দালালকে। রাজমিস্ত্রির কাজের সুবাদে নবী হোসেনের বাবা আবদুল মন্নানের পরিচয় হয়। পরে মন্নানই মহিবুরকে গ্রিসে যেতে উৎসাহিত করেন।

মহিবুরের মৃত্যুর খবরে তাঁর মা মহিমা বেগম বিছানায় শয্যাশায়ী। বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি। তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ছোট ভাই হাফিজুর রহমান অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে প্রথমে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং আজ বুধবার পাঠানো হয়েছে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া সুনামগঞ্জ ছাতক উপজেলার ঘাগলাজুড় গ্রামের তরুণ মহিবুর রহমানের বাবা নুরুল আমিনের আহাজারি। বুধবার দুপুরে তোলা
ছবি: সংগৃহীত

মোহাম্মদ সুনু মিয়া বলেন, ‘পরিবারটি নেহায়েত দরিদ্র। আগে তো আমরা এত কিছু জানি না। শুধু জমি বিক্রির কথা জানি। এখন এত টাকার লেনদেন, ঋণের কথা শুনছি। পুরো পরিবার শেষ হয়ে গেল।’

মহিবুর রহমানের বাবা নুরুল আমিনের কান্না যেন থামছে না। তিনি কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, ‘আমার বাইচ্চা ছেলেটারে না খাওয়াইয়া মারছে। আগে দালালে পিঠাইছে টেখার লাগি। মাঝখানে পুয়ায় মেসেজ দিয়া কয়, আব্বা আমারে দেশে নেও। পরে আবার কয় আমার বাপের সবতা বেইচ্যা আইছি, আমি দেশো যাইতাম না। দালালে কইছিল কাঠের বোটও দিব, পরে প্লাস্টিকের বোটও দিয়া মারল।’

ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি বিষয়টি আজ (বুধবার) বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। আমাকে কেউ জানায়নি। এলাকাটি থানার জাউয়া পুলিশ ফাঁড়ি এলাকায় হওয়ায় আমি ফাঁড়ির ইনচার্জকে খোঁজ নিতে বলেছি।’

এর আগে শনিবার ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া সুনামগঞ্জের ১২ জনের নাম-পরিচয় নিশ্চিত করে পুলিশ। এর মধ্যে দিরাই উপজেলার ছয়জন, জগন্নাথপুর উপজেলার পাঁচজন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার একজন ছিলেন। এখন ছাতক উপজেলার আরেকজনের মৃত্যুর বিষয়টি জানাল পরিবার।

লিবিয়া থেকে রাবারের ওই বোট (নৌযান) ২১ মার্চ গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করার পর ভূমধ্যসাগরে পথ হারিয়ে ফেলে। সাগরে বোটটি ছিল ছয় দিন। এ সময় জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। এ কারণে খাবারসংকট দেখা দেয়। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনাহারে দুর্বল হয়ে একে একে বোটের ২২ জন মারা যান। তাঁদের বেশির ভাগই সুনামগঞ্জের। দুই দিন লাশগুলো বোটেই ছিল। একপর্যায়ে লাশে দুর্গন্ধ দেখা দিলে দালালের নির্দেশে সেগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। ২৭ মার্চ শুক্রবার গ্রিসের উপকূলে ওই বোটে থাকা অন্যদের উদ্ধারের পরই মৃত্যুর বিষয়টি জানাজানি হয়। সুনামগঞ্জে স্বজনদের কাছে মৃত্যুর খবর আসে শনিবার বিকেলে। দালালেরা সাগরপথে লিবিয়া-গ্রিসের এই বিপজ্জনক যাত্রাকে ‘গেম’ বলে।

এদিকে ভূমধ্যসাগরের এই মৃত্যুর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সুনামগঞ্জের দুটি থানায় ৯ দালালের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে। জগন্নাথপুর থানায় পাঁচজন এবং দিরাই থানার মামলায় আসামি আছেন চারজন। ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া দুই তরুণের বাবা সোমবার রাতে এই দুটি মামলা করেছেন। আসামিদের মধ্যে কেউ কেউ লিবিয়া, গ্রিস ও ইতালিতে আছেন।