ব্যাংকঋণ নিয়ে আর্জেন্টিনার ভক্ত উড়িয়েছেন পতাকা, রাঙিয়েছেন নিজের ভ্যানগাড়ি
ভ্যানগাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন সুমন গৌড় ওরফে সুমন মেসি (৩৫)। এরপরও একটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে সাজিয়েছেন তাঁর উপার্জনের একমাত্র বাহন ভ্যানগাড়িটি। কিনেছেন আর্জেন্টিনার জার্সি। জার্সির সঙ্গে মিল রেখে (ম্যাচিং) কিনেছেন লুঙ্গিও। তাঁর পছন্দের ফুটবল দল আর্জেন্টিনাকে ভালোবেসে এলাকায় টানিয়েছেন বড় আকারের ১৬টি আর্জেন্টিনার পতাকা।
শুধু এ বছর নয়, অনেক বছর ধরেই বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই আর্জেন্টিনার প্রতি সুমনের আবেগের এমন বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তাঁর এমন কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকাবাসী তাঁর নাম রেখেছেন ‘সুমন মেসি’। এখন তিনি এ নামেই বেশি পরিচিত। মেসি নামে ডাকলে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন সুমন গৌড়।
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পৌর শহরের দত্তপাড়া গ্রামের সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে বসবাস করেন সুমন গৌড়। আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের প্রতি তাঁর এমন কাণ্ডে এলাকায় বেশ আলোচিত তিনি। তবে সুমনের এমন কার্যকলাপে বিব্রত তাঁর হতদরিদ্র পরিবার।
সুমন একজন দরিদ্র ভ্যানচালক। ভ্যান চালিয়ে উপার্জিত অর্থে চলে তাঁর সংসার। এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে মেয়ে পুষ্প রানীকে বিয়ে দিয়েছেন। ১২ বছর বয়সী ছেলে দিগন্ত গৌড় ঢাকায় বোনের সঙ্গে থাকে। এ বছর বিশ্বকাপ খেলাকে ঘিরে সম্প্রতি গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন সুমন। সেই টাকায় শুরু করছেন প্রিয় দলের প্রচার।
সুমনের স্ত্রী আরতি গৌড় বলেন, ‘বিয়ের পর থেকেই স্বামীর এমন পাগলামি দেখছি। অভাবের সংসারে অনেক না করলেও ফুটবল খেলা এলে তিনি কিছু মানেন না। সংসার চলে খুব কষ্টে। সপ্তাহে সাড়ে চার হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। আজ কিস্তির লোক আইলে মাইনষের কাছ থেকে টাইনা আইনা কিস্তি দিছি। অভাবের কারণে ছেলেরে মেয়ের বাড়িত পাঠিয়ে দিছি।’ আরতি গৌড় আরও বলেন, ‘বিশ্বকাপ খেলা আসলে এক-দুই মাস আগে থেকেই কামকাজ ছাইড়া খেলা নিয়া পড়ে পাতাকা টাঙায়। আর্জেন্টিনা জিতলে মানুষরে বিরানি রাইন্দা খাওয়ায়। সংসারের ক্ষতি কইরা এই কামডা করতাছে, তার পরও জামাইরে মানাইতে পারি না।’
ভ্যানচালক সুমন গৌড় বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক। আর্জেন্টিনা ও মেসি আমার আবেগ, আমার ভালোবাসা। আর্জেন্টিনার প্রতি সেই ভালোবাসার জায়গা থেকেই নিজের ভ্যানগাড়িটি আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে সাজিয়েছি। আমার এলাকায় বড় পতাকাও টানিয়েছি। ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ তুলে এসব করেছি। আমার ভক্ত দেখলেই চা-পান খাওয়াই, আর্জেন্টিনার ভক্তদের নিয়ে আনন্দে থাকতে ভালো লাগে। দলকে ভালোবাসি, তাই ঋণ করে এসব করছি।’
আর্জেন্টিনা নিয়ে এমন কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকায় বেশ পরিচিতি পেয়েছেন সুমন গৌড়। স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘সুমন আর্জেন্টিনার পাগল ভক্ত। ঋণ করে এসব পাগলামির দরকার নেই—বোঝালেও সে কারও কথা শোনে না। এলাকাজুড়ে পতাকা টানিয়েছে, নিজের গাড়ি আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে রাঙিয়েছে, একই রকম পোশাক পরেও ঘোরে। যারা এলাকায় খেলা দেখবে তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থার কথা বলতেছে। নিজের ঘরে ভাত না থাকার পরও ঋণ করে এসব করতেছে। এলাকাবাসী না করলেও সুমন বলে, আর্জেন্টিনা দলকে ভালোবেসে এসব করছে সে। দলকে সমর্থন করলেও ঋণ করে এ ধরনের পাগালামি যেন কেউ না করে।’