চুয়েটে অচলাবস্থা কাটেনি, সপ্তম দিনে গড়াল ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবস্থান কর্মসূচি। আজ দুপুরে উপাচার্য ভবনের সামনেছবি: প্রথম আলো

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সপ্তম দিনের মতো চলছে শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। উপাচার্য পদে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীরা এই কর্মসূচি পালন করছেন। একই দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবস্থান কর্মসূচিও চলছে।

কর্মসূচির কারণে আজ সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বিদায়ী উপাচার্য আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের ৫৬ দিনের কার্যক্রম স্মরণে রাখতে ‘শ্বেত শাড়ির গণসাক্ষ্য’ কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচির অংশ হিসেবে একটি সাদা শাড়িতে রং-তুলি দিয়ে বিদায়ী উপাচার্যের প্রতিকৃতি এবং তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়েছে।

আমাদের দাবি একটাই, সরকার যে প্রজ্ঞাপনটা জারি করেছে, সেই প্রজ্ঞাপনটা আমরা প্রত্যাহার চাচ্ছি। এর উদ্দেশ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয়তা ধরে রাখা। আমাদের এখানে শিক্ষকদের চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই।
সৈয়দ মাসরুর আহম্মদ বলেন, সহযোগী অধ্যাপক, যন্ত্রকৌশল বিভাগ-চুয়েট।

গত ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। দায়িত্ব নেওয়ার ৫৬ দিনের মাথায় গত সোমবার তাঁকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর পর থেকেই অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা।

আজ দুপুরে শ্বেত শাড়ির গণসাক্ষ্য কর্মসূচিতে গিয়ে দেখা যায়, একটি সাদা শাড়ির ওপর রং-তুলি ও মার্কার দিয়ে উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক সায়েমের নানা কর্মকাণ্ড ফুটিয়ে তুলছেন শিক্ষার্থীরা। সেখানে তাঁর প্রতিকৃতি আঁকতেও দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীরা জানান, বিদায়ী উপাচার্য তাঁর ৫৬ দিনের দায়িত্বকালে যেসব উদ্যোগ নিয়েছেন এবং তাঁর সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনাকে স্মরণে রাখতে এই কর্মসূচি পালন করছেন তাঁরা।

সাদা শাড়িতে রং–তুলি দিয়ে আঁকছেন শিক্ষার্থীরা। আজ দুপুরে
ছবি: প্রথম আলো

শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবস্থান কর্মসূচি

উপাচার্য পদে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে চুয়েট শিক্ষক সমিতি। বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত উপাচার্য ভবনের সামনে তাঁরা এ কর্মসূচি পালন করেন।

কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ মাসরুর আহম্মদ বলেন, ‘আমাদের দাবি একটাই, সরকার যে প্রজ্ঞাপনটা জারি করেছে, সেই প্রজ্ঞাপনটা আমরা প্রত্যাহার চাচ্ছি। এর উদ্দেশ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয়তা ধরে রাখা। আমাদের এখানে শিক্ষকদের চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যথেষ্ট দুশ্চিন্তা ও মানসিক হতাশার মধ্যে আছি। আমাদের এই প্রকৌশলীরা পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলে তাদের সমসাময়িক অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা পাস করে বেরিয়ে গিয়ে চাকরির বাজারে ঢুকে যাবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়বে। আমরা ক্লাস নেওয়ার জন্য যথেষ্ট উদ্‌গ্রীব অবস্থায় আছি, চেষ্টাও করছি। সরকারের প্রতি আমাদের বিনীত আবেদন, এই অচলাবস্থা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।’

কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি প্রকৌশলী সৈয়দ মো. ইকরাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের চুয়েট একটা পরিবার। শিক্ষার্থীরা যে দাবিতে আন্দোলন করছেন, শিক্ষকেরাও একই দাবিতে কর্মবিরতিতে আছেন। এই দাবি তো যৌক্তিক। আমরাও এই দাবির পক্ষে আছি। তাই আমরা কর্মবিরতির পাশাপাশি অবস্থান কর্মসূচি পালন করছি।’

শিক্ষক সমিতির নিন্দা

২৬ সেপ্টেম্বর রাতে চুয়েট শিক্ষক সমিতির প্রায় আড়াই ঘণ্টাব্যাপী জরুরি সাধারণ সভা অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়। ওই অনলাইন সভার একটি অংশ ভিডিও আকারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে দাবি করা হয়, শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে উসকে দিচ্ছেন। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমেও এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। শিক্ষক সমিতির দাবি, সামগ্রিক আলোচনা ও প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করে কথোপকথনের একটি বিচ্ছিন্ন অংশ প্রচার করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে আজ শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ সভায় সদস্যদের বিভিন্ন মতামত, উদ্বেগ ও করণীয় নিয়ে মুক্ত আলোচনা হওয়াই স্বাভাবিক। বিচ্ছিন্ন বক্তব্যকে শিক্ষক সমিতির সামগ্রিক অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা অসংগত ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিপন্থী। এ ধরনের প্রচারণায় শিক্ষকেরা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পাশাপাশি তথ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট যাচাই করে দায়িত্বশীলভাবে সংবাদ ও মতামত প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে শিক্ষক সমিতি।

ফাঁকা শ্রেণিকক্ষ
ছবি: প্রথম আলো

শাটডাউনে স্থবির একাডেমিক কার্যক্রম

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অংশ হিসেবে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে চুয়েটে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলছে। এতে বন্ধ হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

শাটডাউনের পাশাপাশি গত সাত দিনে ‘লাল কার্ড প্রদর্শন’, ‘মশাল মিছিল’, ‘৫৬ কেন’সহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা। আজ সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে বাংলা চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে।