জাহেরুল ইসলাম ঘুরে ঘুরে ভ্যানে ফল বিক্রি করেন। আমেনা বেগম নির্মাণশ্রমিক, নুরবানু হোটেলশ্রমিক আর সদানন্দ বর্মন পেশায় কৃষিজীবী। তাঁদের কথা, সৎ-যোগ্য, ভালো ব্যক্তি জনপ্রতিনিধি হলে তাঁদেরই লাভ। যিনি সৎ ও যোগ্য, সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে থাকবেন আর এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন, তাঁরা এমন প্রার্থীকেই নির্বাচিত করতে চান।
গত রোববার সরেজমিনে ঠাকুরগাঁও পৌর শহর, সদর, বালিয়াডাঙ্গী ও রানীশংকৈল উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার ভোটারদের সঙ্গে এই প্রতিনিধির কথা হয়। নির্বাচন সামনে রেখে তাঁদের কথায় এসব প্রত্যাশা ও দাবি উঠে আসে।
১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ করা হবে। ঠাকুরগাঁওয়ের তিনটি আসনে ২০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনটি আসনের প্রার্থীদের মধ্যে সাতজন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার করেছেন। একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমএস ডিগ্রিধারী। পাঁচজন করে স্নাতক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস। আর একজন করে মাধ্যমিক সমমান ও অষ্টম শ্রেণি পাস। পেশার দিক দিয়ে পাঁচজনের পেশা কৃষি, কৃষিকাজের পাশাপাশি ব্যবসা করেন দুজন আর সরাসরি ব্যবসা করেন তিনজন। দুজনের পেশা চিকিৎসা ও দুজনের শিক্ষকতা। একজন করে কৃষিকাজের পাশাপাশি শিক্ষকতা, কৃষিকাজের পাশাপাশি ঠিকাদারি, কৃষি-ব্যবসা-পরামর্শক, কৃষি-চাকরি-চিকিৎসা করেন। আর একজনের পেশা গৃহিণীর পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও একজন ছাত্রী।
প্রার্থীদের প্রচার এখন তুঙ্গে। প্রার্থীরা উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে ছুটছেন ভোটারদের কাছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও পথসভায় ব্যস্ত সময় পার করেছেন তাঁরা।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা শহরে ঘুরে ঘুরে ভ্যানে ফল বিক্রি করেন বড় পলাশবাড়ী গ্রামের জাহেরুল ইসলাম। রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চৌরাস্তায় তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘ভেল্লা (বহু) দিন মনের মতো করে ভোট দিবা পারো নাই। এইবার ভোট দিমো। কাহ কাহ কহছে এই এমপিখান বেশি দিন টিকিবেনি। টিকোক আর না–ই টিকোক, এক দিনের তানে এমপি থাকিলেও ভালো মানুষটাক ভোট দিমো।’
ভ্যানচালক রশিদুল ইসলাম বছর ১২ আগে ভোটার হয়েছেন। গত তিনটির মধ্যে দুটি নির্বাচনে কেন্দ্রে যেতে পারেননি তিনি। আর একবার গিয়ে দেখেন, তাঁর ভোটটি দেওয়া হয়ে গেছে। রশিদুল বলেন, ‘এইবার ভালো ভোট হবে। প্রার্থী লোকেরা সবাই ভোট চাহছে। মুই কহি দিছু, তোমার প্রার্থীখান যদি ভালো লোক হয়, দুর্নীতি করে নাই তাহলে ভোট পাবো।’
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ডাঙ্গী এলাকার একটি হোটেলে কাজ করেন নুরবানু (৪৪)। তাঁর হোটেলে এলাকার বিভিন্ন পেশার লোকজনের আড্ডা জমে। এখন আড্ডার একটাই বিষয়, ভোট আর ভোট। নুরবানু বলেন, ‘যায় হামার আপন, তাকই ভোট দিমো।’ আর লাহিড়ি গ্রামের ভ্যানচালক আবুল হোসেন বলেন, ‘বিপদ-আপদে যাক কাছে পাও, তাকই ভোট দিমো।’
ঠাকুরগাঁওয়ের তিনটি আসনে ২০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনটি আসনের প্রার্থীদের মধ্যে সাতজন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার করেছেন। একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমএস ডিগ্রিধারী। পাঁচজন করে স্নাতক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস। আর একজন করে মাধ্যমিক সমমান ও অষ্টম শ্রেণি পাস।
রানীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ এলাকার বাসিন্দা আবু তাহের (৬৯) বলেন, ‘নির্বাচন এলেই সব প্রার্থী এলাকার উন্নয়নে নানান প্রতিশ্রুতি দেন; কিন্তু নির্বাচনের পর তাঁদের কোনো খবর থাকে না। তাই আমরা চাই নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হোক, যাতে সবাই নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন ও তাঁদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নিতে পারেন।’
সদর উপজেলার ঢোলারহাট এলাকায় খেত থেকে আলু তোলায় ব্যস্ত কৃষক-শ্রমিক। ১৫ জন শ্রমিক সেখানে কাজ করছেন। তাঁদের একজন সদানন্দ বর্মন (৫৬)। নির্বাচনের প্রসঙ্গ আসতেই তিনি বলতে লাগলেন, ‘এইবার হামাক ধরে টানাটানি হচে। অনেকে কহছে হামরা যাক ভোট দিমো, সেই জিতিবে। এইতানে ভয়ত আছু। ভোট দিবা গেইলে ভালো লোকটাকই ভোট দিমো।’
ওই গ্রামের শিক্ষক রনজিৎ রায় (৫৭) বলেন, ‘ভোট দিতে গেলে ভালো-মন্দ বুঝেই আমরা ভোট দেব। যে বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়াবে, সেই আমাদের ভোট পাবে।’
জীবনে কোনো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে প্রথমবার ভোট দেব—এটা ভেবে খুব ভালো লাগছে। তবে যিনি নিজের জন্য নয়, জনগণের উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন—এমন প্রার্থীকেই ভোট দেব।নাছিমা আকতার, কলেজশিক্ষার্থী
ঠাকুরগাঁও পৌর শহরে সড়ক উন্নয়নের কাজ চলছে। মোহাম্মদ আলী সড়কে কাজ করছেন এক দল শ্রমিক। তাঁদের মধ্যে অনেকেই নারী। কাজের ফাঁকে নিশ্চিন্তপুর এলাকার শ্রমিক আমেনা বেগম বলেন, ‘আমরা পরিশ্রম করে খাই। আমাদের কোনো চাওয়া নাই। ভোট শেষে যে আমাদের নিজের ভাই-বোন মনে করবে, আমরা তাঁকেই ভোট দেব।’
সদর উপজেলার ভোলাজান গ্রামের কলেজশিক্ষার্থী নাছিমা আকতার (২০) নতুন ভোটার হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জীবনে কোনো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে প্রথমবার ভোট দেব—এটা ভেবে খুব ভালো লাগছে। তবে যিনি নিজের জন্য নয়, জনগণের উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন—এমন প্রার্থীকেই ভোট দেব।’
ঠাকুরগাঁও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বলেন, ভোটাররা তাঁদের ইচ্ছেমতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কোনো প্রার্থীর পক্ষেই বিন্দুমাত্র দুর্বলতা দেখানোর সুযোগ নেই।