উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় স্বাধীনতার পরে উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার হাত থেকে জানমাল রক্ষার্থে অনেকগুলো মাটির কিল্লা নির্মাণ করা হয়। তখন থেকেই এগুলো মুজিব কিল্লা নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই কিল্লাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিছু কিছু এলাকার কিল্লা ও এর পাশের জমি বেদখল হয়ে যায়। এসব কিল্লার সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য ২০২১ সালে মুজিব কিল্লা নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কলাপাড়া উপজেলায় ২০টি মুজিব কিল্লা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে ১৮টি কিল্লার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। বাকি দুটি কিল্লার নির্মাণকাজ চলমান।

এ এবং বি দুই ধরনের মুজিব কিল্লা নির্মাণ করা হয়েছে। এ ক্যাটাগরির কিল্লায় ৫০০ জন এবং বি ক্যাটাগরির কিল্লায় ১ হাজার জনের ধারণক্ষমতা। প্রতিটি কিল্লার মাটি থেকে উচ্চতা ১১ ফুট। এ এবং বি-তে গরু-বাছুর রাখার জন্য ৮০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৫০ ফুট প্রস্থের ‘ক্যাটেল শেড’ রাখা হয়েছে। তা ছাড়া কিল্লার ওপর নির্মিত অবকাঠামোর এক পাশে নারী ও অপর পাশে পুরুষের থাকার জন্য নির্দিষ্ট করে জায়গা রাখা হয়েছে। সোলারসহ বিদ্যুৎ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। রয়েছে ১৮টি সিলিং ফ্যান। এ ছাড়া প্রতিটি কিল্লায় আটটি শৌচাগার, আশ্রয়কালীন রান্না করে খাওয়ার জন্য অবকাঠামোর দুই পাশে দুটি ঘর করা হয়েছে। সুপেয় পানির জন্য গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। ছোট কিল্লার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং বড় কিল্লা নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা।

উপজেলার চাকামইয়া ইউনিয়নে নেওয়াপাড়া দাখিল মাদ্রাসার পাশেই রয়েছে একটি মুজিব কিল্লা। ওই গ্রামের বাসিন্দা ও নেওয়াপাড়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার তালুকদার শামসুল আলম বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব কিল্লার রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। যে কারণে এসব অবকাঠামো নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কিল্লাটি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে দেখাশোনার জন্য দায়িত্ব দিতে উপজেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কাজে এসব কিল্লা ব্যবহার করতে পারব। দুর্যোগের সময় মানুষ এতে আশ্রয় নিতে পারবে। এতে কিল্লাগুলো ভালো থাকবে।’

টিয়াখালী ইউনিয়নের পূর্ব টিয়াখালী গ্রামের কিল্লাটিও বেহাল হয়ে আছে। গ্রামের বাসিন্দা আল আমিন নকতি ও ফোরকান হাওলাদার বলেন, কিল্লার চারদিক মাটি ফেলে উঁচু করা হয়েছে ঠিকই, নির্মাণের সময় সব দিকে কংক্রিটের ব্লক দেওয়া হয়নি। এ কারণে বর্ষায় উত্তর ও পশ্চিম পাশের পুরো মাটি ধসে নেমে গেছে। ব্লক দিয়ে মাটি রক্ষা করা না হলে একসময় কিল্লার মূল অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়বে।

গত অক্টোবরে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের সময় বিভিন্ন মুজিব কিল্লায় লোকজন আশ্রয় নেয়। নীলগঞ্জ ইউনিয়নের গৈয়াতলা গ্রামের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের পর মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেলেও কিল্লা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়নি। নোংরা অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

কিল্লার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) কলাপাড়া উপজেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আছাদউজ্জামান খান বলেন, ঝড়-পরবর্তী সময়ে কিল্লাগুলো স্থানীয় মানুষকে বহুমুখী কাজে ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত। এতে কিল্লা ভালো থাকবে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনকে বলা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শংকর চন্দ্র বৈদ্য বলেন, ‘এটা ঠিক, মুজিব কিল্লাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য এখন পর্যন্ত কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় এ নিয়ে আলোচনা করব। প্রতিটি মুজিব কিল্লার রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে হবে, কারা করবে, সবকিছুর একটা বিস্তারিত নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। এরপর দেখভাল করার জন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে।’