কারখানায় হাত হারিয়েছিলেন, চার দশক ধরে পাঁপড় বিক্রি করেন সামাদ

আবদুস সামাদ প্রতিদিন ঘুরে ঘুরে পাঁপড় বিক্রি করেন। গতকাল শনিবার যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া রেলস্টেশনেছবি : প্রথম আলো

বাঁ হাতের কবজি নেই আবদুস সামাদের (৬৫)। সেই বাঁ হাতের কনুই ভাঁজ করে তিনি কোমরের সঙ্গে চেপে ধরে রাখেন প্লাস্টিকের বড় একটি গামলা। গামলায় সাজানো পাঁপড়ের প্যাকেট। সারা দিন ঘুরে ঘুরে তিনি এই পাঁপড় বিক্রি করেন। প্রায় চার দশক এভাবে পাঁপড় বিক্রি করছেন আবদুস সামাদ।

আবদুস সামাদের বাড়ি যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া গ্রামে। তিনি প্রতিদিন উপজেলার নওয়াপাড়া বাজার এবং নওয়াপাড়া রেলস্টেশনে ঘুরে ঘুরে পাঁপড় বিক্রি করেন।

আবদুস সামাদ জানান, তাঁর বাড়ি ছিল কুমিল্লায়। ১৯৮৫ সালে তিনি অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়ায় আসেন; শ্রমিক হিসেবে চাকরি নেন রাষ্ট্রায়ত্ত বস্ত্রকল বেঙ্গল টেক্সটাইল মিলসে। তিনি স্থায়ী শ্রমিক ছিলেন। দুই বছর পর ১৯৮৭ সালে বস্ত্রকলে কাজ করার সময় তাঁর বাঁ হাত মেশিনের মধ্যে ঢুকে যায়। পরে অস্ত্রোপচার করে তাঁর হাতের কবজি পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়। অসুস্থ হয়ে পড়েন আবদুস সামাদ। ওই বছরই তাঁকে বস্ত্রকলের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বস্ত্রকল থেকে পাওয়া টাকা দিয়ে তিনি নওয়াপাড়া গ্রামে পাঁচ কাঠা জমি কেনেন। সেই জমিতে তিনি চারটি কক্ষ এবং ওপরে টিনের ছাউনি দিয়ে একটি পাকা ঘর তোলেন। মাথা গোঁজার মতো ঠাঁই হয় তাঁর। কিন্তু তিনি বেকার হয়ে পড়েন। এক হাত দিয়ে কোনো কাজ করতে না পারায় অনেক চেষ্টা করেও তিনি আর কোনো কাজ পাননি। সংসারের খরচ চালাতে তিনি শুরু করেন পাঁপড় বিক্রি। স্ত্রী পাঁপড় ভেজে দেন। তিনি সারা দিন ঘুরে ঘুরে সেই পাঁপড় বিক্রি করেন।

আবদুস সামাদের চার ছেলেমেয়ে—দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে লিটন শেখ (৪৩) অন্যত্র থাকেন; লেবুর ব্যবসা করেন। ছোট ছেলে মনির হোসেন (৩৮) ভ্যান চালান। তিনি বাড়িতে থাকলেও পরিবার নিয়ে পৃথক থাকেন। স্ত্রী জোহরা খাতুনকে (৬০) নিয়ে আবদুস সামাদের সংসার।

আবদুস সামাদ জানান, তিনি টাকা দেন। সেই টাকা দিয়ে ছোট ছেলে প্রতিদিন পাঁপড় ও তেল কিনে আনেন। ফজরের নামাজের সময় ঘুম থেকে উঠে স্ত্রী পাঁপড় ভাজেন। এরপর ভাজা পাঁপড় দুটো দুটো করে পলিথিনের প্যাকেটে ভরে পলিথিনের মুখ পাটের সুতা দিয়ে বাঁধা হয়। পাঁপড়ের প্যাকেট একটি বড় প্লাস্টিকের বা অ্যালুমিনিয়ামের গামলায় সাজিয়ে তিনি গামলা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।

প্রতিদিন সকাল সাতটায় আবদুস সামাদ বাড়ি থেকে পাঁপড় নিয়ে বের হন। এরপর তিনি নওয়াপাড়া রেলস্টেশন, নওয়াপাড়া বাজার এবং নওয়াপাড়া বাজারের যশোর-খুলনা মহাসড়ক ধরে ঘুরে ঘুরে পাঁপড় বিক্রি করেন। বেলা একটা পর্যন্ত তিনি পাঁপড় বিক্রি করেন। কিন্তু সব পাঁপড় বিক্রি হয় না। অবিক্রীত পাঁপড় নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। গোসল করে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার বিকেল চারটায় তিনি বাড়ি থেকে পাঁপড় নিয়ে বের হন। রাত আটটা পর্যন্ত তিনি পাঁপড় বিক্রি করেন। কোনো কোনো দিন আগেই সব পাঁপড় বিক্রি হয়ে যায়।

আয়–রোজগার আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তবু টাকার জন্য কারও কাছে হাত পাততে হয় না। এই আয় দিয়ে অনেক কষ্ট করে সংসার চালাই।’
আবদুস সামাদ, পাঁপড় বিক্রিতা

আবদুস সামাদ জানান, প্রতিদিন তিনি গড়ে ১০০ পাঁপড় বিক্রি করেন। প্রতিটি পাঁপড়ের দাম পাঁচ টাকা। দিনে ৫০০ টাকার মতো বিক্রি হয়। ১০০ পাঁপড় ভাজতে প্রায় এক কেজি তেল লাগে। সব খরচ মিলিয়ে তিন শ থেকে সাড়ে তিন শ টাকা খরচ হয়। খরচ বাদ দিয়ে প্রতিদিন তাঁর দেড় শ থেকে দুই শ টাকার মতো থাকে। এই টাকা দিয়ে সংসার চলে তাঁর।

আবদুস সামাদ বলেন, ‘আগে পাঁপড় ও তেলের দাম কম ছিল। ক্রেতা বেশি ছিল। বেশি লাভ হতো। এখন পাঁপড় ও তেলের দাম বেড়ে গেছে। ক্রেতাও আগের মতো নেই। এখন আয়–রোজগার আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। আবার সব জিনিসের দাম অনেক বেশি। এই আয় দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তবু টাকার জন্য কারও কাছে হাত পাততে হয় না। এই আয় দিয়ে অনেক কষ্ট করে সংসার চালাই।’