ওএমএসের চাল বিক্রির সারিতে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে হাতের তালুতে সিরিয়াল নম্বর
রাজশাহী নগরের খোঁজাপুর এলাকার ষাটোর্ধ্ব মনোয়ারা বেগম ফজরের নামাজ শেষ করে এসেছেন খোলা বাজারের চাল (ওএমএস) কিনতে। সকাল পৌনে ৯টার দিকে চাল বিক্রির নির্ধারিত স্থান ছেড়ে কিছুটা দূরে বসে থাকতে দেখা গেল তাঁকে। দূরে বসে থাকার কারণ জানতে চাইলে মনোয়ারা তাঁর ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘ভোরে এসে হাতের তালুতে সিরিয়াল নাম্বার লিখে নিছি। আমার সিরিয়াল কেউ নিতে পারবে না।’
নগরের বিনোদপুর এলাকায় মনোয়ারার সঙ্গে কথা হয়। মনোয়ারার স্বামী নেই। বয়সের ভারে কিছুটা ন্যুয়ে পড়েছেন। মনোয়ারা জানালেন, সকাল নয়টার পর ট্রাক আসবে। ঠেলাঠেলি করে তাঁর পক্ষে চাল কেনা সম্ভব নয়। এখানে প্রায়ই চাল বিক্রির সময় মারামারি লেগে যায়। অনেক সময় নিজেদের মধ্যে মারামারির কারণে চাল শেষ না করেই ট্রাক চলে যেত। এতে তাঁদের নিজেদেরই ক্ষতি হয়। পরে কয়েকজন আলোচনা করে সারি ঠিক রাখার জন্য হাতের তালুতে সিরিয়াল নম্বর লেখার ব্যবস্থা করেছেন। রাণু বেগম নামে এক নারী লিখতে পারেন। তিনিই সেখানে উপস্থিত নারীদের হাতের তালুতে নম্বর লিখে দিয়েছেন। তবে পুরুষ ক্রেতারা নম্বর লিখে নেননি।
সকাল সোয়া ৯টার দিকে ওএমএসের চালের ট্রাক চলে এল। সবাই তখন লাইনে দাঁড়িয়ে গেলেন। এই ট্রাক থেকে ৩০ টাকা দরে ৪০০ জনকে পাঁচ কেজি করে চাল দেওয়া হবে বলে জানালেন ফুড ইন্সপেক্টর আমিরুল ইসলাম। ডিলার শাহীন হোসেনকে তিনি চাল দেওয়া শুরু করতে বললেন। মুহূর্তের মধ্যেই পুরুষদের সারিতে ঝটলা বেঁধে গেল। কয়েকজন ধাক্কাধাক্কি শুরু করে দিলেন। তখনই রাণু নামের ওই নারী বেরিয়ে এসে বললেন, ‘পুরুষ বেটাদের বললাম, হাতের তালুতে সিরিয়াল লিখে নিতে। তারা শুনল না।’
পুরুষদের সারিদের ঠেলাঠেলির মধ্যেই দুজন নারীর পর একজন পুরুষকে চাল দেওয়া শুরু হলো। পরিবেশক শাহীন হোসেন নির্দিষ্ট ফরমে নাম লিখে পাশেই একটি টিপসই নিলেন। তারপর টাকা নিয়ে চাল দেওয়া শুরু করলেন।
সেখানে উপস্থিত কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই জায়গায় আগে মারামারি লেগে যেত। অনেকে ফজরের নামাজ পড়ে এখানে অপেক্ষা করলেও চাল পেতেন না। একটানা লাইনে অনেকেই দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। আবার কোনো কারণে সারি থেকে কেউ ছিটকে পড়লে আর সেখানে দাঁড়াতে পারেন না। পরে সিদ্ধান্ত হয়, নারীদের হাতের তালুতে কলম দিয়ে সিরিয়াল নম্বর লিখে দেওয়া হবে। আরেকটি সিদ্ধান্ত হলো, প্রতিবন্ধী, বেশি অসুস্থ, শিশুসন্তান নিয়ে লাইনে দাঁড়ানো নারীদের আগে চাল নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন তাঁরা।
প্রতিদিন সিরিয়াল লিখে দেওয়ার কাজ করেন রাণু বেগম। তিনি বলেন, ‘নিজেরা নিজেরা মারামারি করতাম। এতে নিজেদেরই ক্ষতি হয়ে যেত। নিজেদের মধ্যে শত্রুতা বেড়ে যেত। তাই ঠিক করা হলো, আগে আসলে আগেই যেন চাল নিতে পারে। সেই জন্য সিরিয়াল নম্বর লিখে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন আগের চেয়ে কম ধাক্কাধাক্কি হয়।’
রাবেয়া আক্তার নামে এক ষাটোর্দ্ধ নারী বলেন, তাঁর হাতের তালুতে সিরিয়াল নম্বর লিখে নিয়ে কিছুটা দূরে গিয়ে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। পরে সময়মতো আবার এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। তবে হাতের সিরিয়াল নম্বর মুছে গেলে আবার একবারে পেছনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। তাই চাল না পাওয়া পর্যন্ত তিনি ডান হাত ভেজাননি।
একজনই কয়েকবার চাল নেন
নগরের ওই পয়েন্টে আজ সকাল থেকে ট্রাকের চাল শেষ হওয়া পর্যন্ত এই প্রতিবেদক উপস্থিত ছিলেন। এই পয়েন্টে বেশ কয়েকজন নারী ও পুরুষকে একাধিকবার চাল নিতে দেখা গেছে। দুইবার চাল নিয়েছেন এমন এক নারী বলেন, তাঁর সংসারে অভাব। দুই ছেলে আছে। স্বামী মারা গেছেন। পাঁচ কেজি চাল নিজেদের জন্য। আর পাঁচ কেজি বিক্রি করে অন্য কিছু কিনবেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক পুরুষ বললেন, তিন ছেলে থাকলেও কেউ তাঁর খোঁজখবর নেন না। ছেলেদের আর্থিক অবস্থাও ভালো না। এর মধ্যে তাঁর নিয়মিত ওষুধ কিনতে হয়। সবকিছু মাথায় রেখে তিনি ১০ কেজি চাল কিনেছেন। পাঁচ কেজি চাল ছেলেদের দেবেন। আর পাঁচ কেজি বিক্রি করে তিনি ওষুধ কিনবেন।
খাদ্য পরিদর্শক আমিরুল ইসলাম শেষ পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। তিনি বলেন, ওএমএসের লাইনে বিচিত্র সব ঘটনা ঘটে। এই চাল শুধু হতদরিদ্রদের পাওয়ার কথা। কিন্তু অনেকে হতদরিদ্র না হয়েও লাইনে এসে দাঁড়ান। আবার একই ব্যক্তি একাধিকবার চাল নেন। এতে করে আসল সুবিধাভোগী চাল পান না। তবে তাঁরা চেষ্টা করেন সঠিক মানুষকে চাল দিতে।
লাইনে মারামারির বিষয়ে তিনি বলেন, লাইনে অনেক কিছুই হয়। তাঁরা সব সময়ই লাইন ঠিক করতে বলেন। আবার সুবিধাভোগীরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে, আবার নিজেরাই বিবাদ মিটিয়ে ফেলে। নারীরা যেমন, নিজেরা হাতের তালুতে সিরিয়াল লিখে রেখে লাইন ঠিক রাখছেন।
রাজশাহী নগরে সপ্তাহে পাঁচ দিন ৯টি ট্রাকে ৯ জায়গায় এবং ২১টি দোকানে ওএমএসের চাল বিক্রি করা হয়। ট্রাকগুলোয় ২ হাজার কেজি চাল আর দোকানগুলোয় ১ হাজার কেজি চালের পাশাপাশি প্রতিদিন দেড় হাজার কেজি আটা বিক্রি করা হয়।