বর্তমানে ওই নারী খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ওই নারী এখনো ঠিকমতো কথা বলতে পারছেন না।

হাসপাতালে ওই নারীর স্বামী বলেন, ঘটনার এক দিন পর তাঁর স্ত্রীর জ্ঞান ফেরে। তবে ১০ থেকে ১৫ মিনিট তা স্থায়ী হওয়ার পর আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। জ্ঞান ফেরার পর অসংলগ্ন কথা বলছিলেন। বারবার বলছিলেন, ‘আমাকে মেরো না।’

ওই নারীর স্বামী বলেন, ঘটনার পর থেকে ওই নারী খেতে পারছেন না। গতকাল বৃহস্পতিবার একবার খাওয়ার চেষ্টা করলেও বমি করেছেন। মাথায় আঘাত লাগায় চিকিৎসকেরা সিটিস্ক্যান করেছেন।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওই ওয়ার্ডের ইন্টার্ন চিকিৎসক তারেক আহমেদ আজ সকালে প্রথম আলোকে বলেন, ওই রোগীর বর্তমান অবস্থা কিছুটা ভালো। মাথায় আঘাত ও বমি হওয়ায় খারাপ কিছু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে সিটিস্ক্যানের রিপোর্ট মোটামুটি ভালো। তিনি এখন শঙ্কামুক্ত।

ওই নারীর শ্বশুরবাড়ি ও বাবার বাড়ি একই এলাকায়। তবে ঘটনাটি ঘটেছে বাবার বাড়িতে। এলাকাবাসী ও ওই নারীর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পারিবারিক জমি নিয়ে ওই নারীর বাবা ও চাচাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। বর্তমানে সেটি আদালতে বিচারাধীন। ১১ জুলাই ওই নারীর চাচা, চাচাতো ভাইসহ ২৫ থেকে ৩০ জন লোক ওই নারীর বাবার জমিতে ঘর তুলতে আসেন। এ সময় ওই নারী তাঁদের বাধা দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর চাচাতো ভাইয়েরা তাঁকে মারধর করতে করতে বিবস্ত্র করে ফেলেন। পরে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে সড়কের পাশের একটি মেহগনিগাছের সঙ্গে বেঁধে রাখেন। প্রায় এক ঘণ্টা এভাবে নির্যাতন চলতে থাকে।

পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে ওই নারীকে উদ্ধার করে আত্মীয়স্বজনের কাছে হস্তান্তর করে। কয়েক শ মানুষ ওই নির্যাতনের চিত্র দেখলেও কেউ তখন প্রতিবাদ করেননি বলে জানা গেছে। পরে অচেতন অবস্থায় ওই নারীকে প্রথমে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন চিকিৎসকেরা।

ওই নারীর বাবা প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার পর কয়রা থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মাসুদুর রহমান তাঁকে মুঠোফোনে কল করে শনিবার বিকেলে থানায় দুই পক্ষের লোকজন নিয়ে বসে ব্যাপারটি মীমাংসা করার কথা বলেন। অন্যদিকে গতকাল বিকেলে মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের এক গ্রাম পুলিশ এসে জানিয়ে গেছে, চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ শিকারী আজ বিকেলে ব্যাপারটি নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে দুই পক্ষকে নিয়ে বসবেন। কিন্তু গ্রাম পুলিশের ওই নোটিশ তাঁরা ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা এত দিন মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করেছেন বলে মামলা করার সময় পাননি।

মীমাংসার বিষয়ে জানতে চাইলে এএসআই মাসুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নির্দেশে তাঁরা সেখানে গিয়ে ওই নারীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। পরে মহেশ্বরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মুঠোফোনে কল করে ব্যাপারটি নিয়ে থানায় বসে মীমাংসা করার কথা বলেন। সেটিই মুঠোফোনে কল করে ওই নারীর বাবাকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মহেশ্বরীপুর ইউপির চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ শিকারী। তিনি প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘মীমাংসা করার ব্যাপারে কারও সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। কেউ কোনো প্রমাণ দেখাতে পারবে না। ওই নারীর বাবা আমার বিপক্ষে কাজ করেছিলেন, এ কারণে তাঁরা মিথ্যা অভিযোগ করছেন।’

কয়রা থানার পরিদর্শক তদন্ত মো. ইব্রাহিম আলী বলেন, ৯৯৯ থেকে কল পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। পুলিশ গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠায়। ওই নারীর বাবাকে মুঠোফোনে কল করে থানায় অভিযোগ দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে, কিন্তু তিনি থানায় আসেননি। যেহেতু এটা অপরাধ, তাই এ ব্যাপারে থানায় বসে মীমাংসা করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। অভিযোগ পেলে আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন