এ দেশে এক জীবন কাটিয়ে দেওয়া রোজ সিস্টার নিভৃতেই করে চলছেন মানবসেবা। প্রচারে নেই আগ্রহ। শুধু নিজের কাজটা করে যেতে চান। প্রথমে এই প্রতিবেদকের সঙ্গেও দেখা করতে চাইছিলেন না সিস্টার রোজ। দেননি ছবি তুলতেও। তবে কথা বলতে রাজি হওয়ার একপর্যায়ে একটা আক্ষেপের কথা জানিয়েছেন সিস্টার রোজ। তা হলো, এখনো পাননি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাঁচ বছর পরপর পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়ে পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। বাকিটা জীবন এই হাসপাতালে কাটাতে চাই। এ দেশের নাগরিকত্ব পেলে পাসপোর্ট নবায়নের ভোগান্তিতে পড়তে হবে না।’

হাসপাতালটিতে খ্রিস্টোফা অমূল্য বাড়ৈ নামের একজন এমবিবিএস চিকিৎসক ও ৭৫ জন নার্স রয়েছেন। খ্রিস্টোফা অমূল্য বাড়ৈ বলেন, এখানে সকাল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত প্রসূতি ও শিশু কম খরচে সেবা পায় বল্লভপুর মিশন হাসপাতালে।

গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, পূর্ব দিকের ভবনে গর্ভবতী মায়েরা অবস্থান করছেন। স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসবের জন্য তাঁদের শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করার কাজ করছেন কয়েকজন নার্স।

প্রতিষ্ঠানটির নার্স পারভিনা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় ১৭ বছর হলো হাসপাতালে ‘জি ওয়ার্ড’ নামে একটি বৃদ্ধাশ্রমও চালু করা হয়েছে। যেখানে বর্তমানে ১৮ জন আছেন। নার্সিং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটও প্রতিষ্ঠা করেছেন রোজ। এ ছাড়া স্থানীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য গড়ে তোলা কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারে ১৬ জন শিক্ষা নিচ্ছেন।

হাসপাতালের একাধিক সূত্র জানায়, জিলিয়ান রোজ এখানে তিনি নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন স্পেশাল বেবি কেয়ার ইউনিট। সময়ের আগে ভূমিষ্ঠ হওয়া বাচ্চাদের জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবা দেয় রোজের হাতের গড়া প্রতিষ্ঠান।

মুজিবনগর উপজেলার মানিকনগর গ্রাম থেকে ফাইজুল ইসলাম জ্বরে আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে এসেছেন সিস্টার রোজের কাছে। তিনি বলেন, ‘রোজ ম্যাডাম একটু দেখলে খুব দ্রুত সেরে উঠবে আমার ছেলে।’

জিলিয়ান রোজের বাবা সি এ রোজ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। ১৯৩৯ সালে দক্ষিণ ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া রোজ ছোটবেলায়ই বাবাকে হারান। মা ও একমাত্র ভাইয়ের সঙ্গে কাটছিল রোজের দিন। তবে তরুণ বয়সে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন জিলিয়ান রোজ। এরপর খ্রিষ্টধর্ম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন।

বল্লভপুর মিশন হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৯ সালে চার্চ অব বাংলাদেশ বল্লভপুরে প্রায় তিন একর জমির ওপর হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৮১ সালে ধর্মপ্রচার ছেড়ে সরাসরি চিকিৎসাসেবায় কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন রোজ। নার্স হিসেবে যোগ দেন। মাঝখানে ১৯৮৬ সালে বয়োবৃদ্ধ মায়ের সেবার জন্য দেশে ফিরে যান। তবে মা মারা গেলে ওই বছরই ফিরে আসেন বাংলাদেশে।

এলাকার রোগী ও সাধারণ মানুষ জিলিয়ানকে আপনজন মনে করেন বলে জানিয়েছেন মুজিবনগর উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আইয়ুব হোসেন। তিনি বলেন, এখানে সেবা নিতে আসা রোগীদের সঙ্গে জুলিয়ান রোজের মাতৃত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মায়ের মমতামাখা হাত দিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন