ত্রিশালে সেই বটবৃক্ষের নিচে কবি নজরুল কি বাঁশি বাজাতেন

কবি নজরুলের স্মৃতি বিজড়িত বটবৃক্ষ। এ গাছ তলায় বসেই কবি বাঁশা বাজাতেন এমনটি প্রচলন রয়েছে।ছবি : প্রথম আলো

গাছটি ‘নজরুল বটবৃক্ষ’ নামে পরিচিত। জনশ্রুতি আছে, জাতীয় কাজী নজরুল ইসলাম স্কুল ফাঁকি দিয়ে ওই বটগাছের নিচে বসে বাঁশি বাজাতেন। কবি পরলোকে পাড়ি দিয়েছেন প্রায় পাঁচ দশক আগে। তবে সেই বটবৃক্ষ এখনো মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার নামাপাড়া গ্রামে শুকনি বিলের পাড়ে ওই বটগাছের অবস্থান। বটগাছসংলগ্ন স্থানে ২০০৫ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর তাঁর ভিত্তিফলক ও বটগাছকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে রেখে উন্নয়নকাজ করা হয়। যে গাছকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটি আজ অবহেলায় পড়ে আছে।

এদিকে আগামী সোমবার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী। প্রায় দুই দশক পর ত্রিশালে কবি নজরুলের জন্মবার্ষিকী জাতীয়ভাবে উদ্‌যাপিত হবে। আগামীকাল শনিবার দুপুরে জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ইতিমধ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

১৮ মে বিকেলে ত্রিশালের নামাপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বটগাছটির চারপাশে পাকা বেদি। এতে আলপনা আঁকা। গাছটির পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধনী ফলক; যাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাম লেখা। গাছটির আরেক পাশে নজরুল মেমোরিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গাছটি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীরের দূরত্ব ১৫-২০ গজ। আর উদ্বোধনী ফলক থেকে সীমানাপ্রাচীরের দূরত্ব ৫-৭ ফুট। বটগাছটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ ও আশপাশের জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে আছে।

এ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, ‘ঐতিহাসিক বটতলাকে আমরা সংরক্ষণ করতে উদ্যোগ নেব। সংরক্ষণের জন্য সেখানে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা জাদুঘর করা যায় কি না, সেটাও ভাবনায় রাখা হচ্ছে।’

গবেষকদের তথ্যমতে, ভারতের আসানসোল থেকে ১৯১৪ সালের দিকে নজরুল ইসলামকে ত্রিশালের কাজীর শিমলা গ্রামে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন দারোগা রফিজ উল্লাহ। তাঁকে দরিরামপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। প্রথমে দারোগাবাড়িতে থাকলেও পরে স্কুলে যাতায়াতের সুবিধার জন্য ত্রিশালের নামাপাড়ার বিচুতিয়া ব্যাপারীবাড়িতে জায়গির রাখা হয় তাঁকে। অষ্টম শ্রেণিতে ওঠার পর নজরুল ত্রিশাল ছেড়ে চলে যান।

এখানে জাতীয় কবির নামে ত্রিশালে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান। ২০০৮ সালে ত্রিশালের কাজীর শিমলার দারোগাবাড়ি ও বিচুতিয়া ব্যাপারীবাড়িতে প্রতিষ্ঠা করা হয় দুটি কবি নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র। দুটি কেন্দ্রই পরিচালনা করছে নজরুল ইনস্টিটিউট।

ত্রিশালের কাজির শিমলা গ্রামে নজরুল স্মৃতি কেন্দ্র। সম্প্রতি তোলা
ছবি: প্রথম আলো

স্মৃতিকেন্দ্রে নেই পাঠক-দর্শক

১৮ মে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ত্রিশালের কাজীর শিমলা এলাকার দারোগাবাড়িতে অবস্থিত কবি নজরুল স্মৃতিকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ঝাড়ু দিচ্ছেন মালি আবু ইউসুফ দুলাল। স্থানীয় কিছু শিশু ভেতরে দৌড়াদৌড়ি করছে। কেন্দ্রের দেয়ালে টাঙানো রয়েছে নজরুলের হাতে লেখা কবিতা, গান ও ছবি। এখানে থাকা পাঠাগারের ১২টি তাকজুড়ে রয়েছে নজরুলবিষয়ক চার হাজার বই। তবে বেশির ভাগ সময়ই পাঠকশূন্য থাকে পাঠাগারটি।

এ সময় চার বন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিকেন্দ্র দেখতে আসেন ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চুরখাই গ্রামের ইমাম হোসেন। বিভিন্ন বই উল্টেপাল্টে দেখে প্রায় ২০ মিনিট অবস্থান করে চলে যান তাঁরা। ইমাম হোসেন বলেন, ‘ছোটবেলায় বইয়ে কাজী নজরুল ইসলামকে পড়েছি। আজ নিজেরা এখানে ঘুরতে এসেছি। নজরুল যে খাটে ঘুমাতেন, সেটি দেখেছি। তাঁর লেখা বই দেখেছি।’

মালি আবু ইউসুফ দুলাল জানান, এখানে শিশুদের গান শেখানোর কোর্স চালু রয়েছে। সপ্তাহে পাঁচ দিন খোলা থাকে। মাঝেমধ্যে পাঠাগারে বই পড়তে আসে মানুষ।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিচুতিয়া ব্যাপারীবাড়ির স্মৃতিকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ভবনে রং করার কাজ করছেন কয়েকজন শ্রমিক। কেন্দ্রের এক পাশে পরিচ্ছন্নতার কাজ করছিলেন ব্যাপারীবাড়ির বংশধর ও কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত মালি আবদুস সাত্তার। তিনি বলেন, এটা মূলত স্মৃতিকেন্দ্র। নজরুল কিশোরবেলায় এখানে ছিলেন। দুই জায়গায় দুটি স্মৃতিকেন্দ্র হয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে অনেক দর্শনার্থী আসে। কিন্তু যে অবস্থায় আছে, সেটা যথেষ্ট নয়।

কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ফয়জুল্লাহ রুমেল বলেন, দর্শনার্থীর সংখ্যা বা নাম এত দিন কোনো খাতায় সংরক্ষণ করা হয়নি। পাঠক হিসেবে মে মাসের ১৪ তারিখ পর্যন্ত ১৫ জন এবং এপ্রিলে ২৩ জনের নাম পাওয়া গেছে। এর আগে কোনো পাঠকের তথ্য নেই। ২০২৩ সালে এক বছরে ৮৩ জন পাঠক বই পড়তে এলেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে কোনো পাঠক বই পড়েননি। তবে এখান থেকে প্রতি মাসে গড়ে পাঁচ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়।

ফয়জুল্লাহ রুমেল আরও বলেন, দুটি স্মৃতিকেন্দ্র মিলিয়ে মাত্র পাঁচজন কর্মী আছেন। সব দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করা যায় না। পাঠক-দর্শনার্থীরা এলেও তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক রাশেদুল আনাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা অদূর ভবিষ্যতে নজরুলকে নিয়ে এমফিল ও পিএইচডি কোর্স চালু করব। নজরুলসংগীত, সাহিত্য ও আবৃত্তিতে ডিপ্লোমা কোর্স চালুর সম্ভাবনাও রয়েছে।’