অভাব–অনটনে মুষড়ে পড়া ফকির চান পেলেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার
দরজা-জানালাহীন ভাঙাচোরা ঘর। চালের টিনেও ফুটো। বৃষ্টির পানি ঠেকাতে এর ওপরের অংশ প্লাস্টিক দিয়ে ঢাকা। সেই ঘরেই স্ত্রী আর দুই মেয়েকে নিয়ে থাকেন ফকির চান দাশ। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রথমবারের মতো কোনো জেলে হিসেবে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
গত সোমবার রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের হাত থেকে ব্রোঞ্জপদক গ্রহণ করেন ৭০ বছর বয়সী এই জেলে। সারা দেশের ১৬ জন জেলে ৯টি ক্যাটাগরিতে এ পদক পান। তাঁদের মধ্যে ফকির চান অন্যতম।
কুমিরা ইউনিয়নের উত্তর জেলেপাড়ায় ফকির চানের বসতঘর। গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, খালের পাড়ে মাত্র দুই শতক জমির ওপর টিনশেডের ভাঙাচোরা ঘর তাঁর। ঢুকতেই দেখা গেল ভাঙা দরজা। ভেতরে ছোট বারান্দা আর বাঁশের বেড়া দিয়ে বানানো চারটি কক্ষ। পাঁচ কন্যার জনক ফকির চান তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট দুই মেয়ে এখনো পড়াশোনা করছে। বড়জন কণিকা দাশ স্নাতকের দ্বিতীয় বর্ষে, ছোট পূজা দাশ পড়েন একাদশ শ্রেণিতে। নিজে পড়াশোনা না করলেও মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার প্রচেষ্টা রয়েছে বলে জানান ফকির চান। বলেন, অনটনের মধ্যে চলছে তাঁর সংসার।
ফকির চানের বাবা-দাদারাও মাছ ধরতেন। সেই পরম্পরায় তিনিও একই পেশায়। সাগরে তাঁর উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ১৪টি ফাঁড় (জাল বসানোর জায়গা) রয়েছে। কিন্তু সন্দ্বীপ চ্যানেলে মাছ কম থাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে।
গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ইলিশের মৌসুমে দাদন নিয়ে দুজন কর্মচারী রাখতে হয় তাঁর। মাসে জনপ্রতি ২৫ হাজার টাকা মজুরি, নাশতা আর খাওয়াদাওয়ার খরচ দিতে হয় তাঁদের। এরপর সংসার চালানোর পাশাপাশি দাদনের টাকা শোধ করতে হয় তাঁকে। বর্তমানে তাঁর প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। ঋণের কারণে মাছ ধরার মৌসুম শেষে কৃষিকাজ করে আসছেন তিনি।
বাবার পদক পাওয়ার খবরে খুশি ছোট মেয়ে পূজা দাশ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বাবার পদক পাওয়া তাঁদের জন্য খুবই গর্বের। বাবা কখনো অসৎ উপায়ে আয় করেননি। সরকারি নিয়ম মেনে মাছ ধরেন। অভাব আছেন, তবু অন্যায়ে নেই। একজন সাক্ষরজ্ঞান না থাকা মানুষ রাষ্ট্রের প্রধানের পাশে দাঁড়িয়ে পুরস্কার নিলেন—এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে।
প্রতিবেশী বিপ্লব জলদাস প্রথম আলোকে বলেন, ফকির চান কখনো নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করেন না। সাগরে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা মেনে চলেন এবং অন্যদেরও মানতে উৎসাহ দেন। অভাব অনটনের মধ্যেও সন্তানদের শিক্ষিত করেছেন তিনি। সরকারের দেওয়া এই পুরস্কার তাঁর প্রাপ্য।
আইন মেনে মাছ ধরায় ফকির চানের সুনাম এলাকাজুড়েই। কুমিরার জেলে সরদারেরা মিলেই ফকির চানকে পুরস্কার দেওয়ার জন্য উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা কার্যালয়ে নাম প্রস্তাব করেন। জানতে চাইলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মোতাছিম বিল্লাহ্ প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে এই মনোনয়ন দেওয়া হয়। মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক সরেজমিনে কুমিরায় এসে মনোনয়নপ্রাপ্ত ব্যক্তির ঘরবাড়ি, প্রতিবেশী এবং স্থানীয় জেলেসর্দারদের সঙ্গে কথা বলেন। সব বিবেচনায় ফকির চানই পুরস্কারের যোগ্য ছিলেন।