পুঠিয়ায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বাড়িঘর ভাঙচুর-লুটপাট, ৬ দিন পর মামলা নিল পুলিশ

রাজশাহীর পুঠিয়ায় প্রতিপক্ষের হামলায় ভাঙচুর হওয়া বাড়িঘর দেখাচ্ছেন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর দুটি পরিবারের সদস্যরা। বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলার ধোকড়াকুল গ্রামেছবি: প্রথম আলো

রাজশাহীর পুঠিয়ায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী দুটি পরিবারের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার ছয় দিন পর মামলা নিয়েছে পুলিশ। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ৫৫ বছর আগে কেনা জমির দখল নিতে এসে তাঁদের বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। ১২ জুন উপজেলার ধোকড়াকুল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সেলিনা সরকার (৩৩) বাদী হয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে আজ বৃহস্পতিবার তা মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়। মামলায় উপজেলার ধোকড়াকুল দিয়ারপাড়া গ্রামের তৈয়ব আলী (৪৫) সাইফুল (৫০), মাসুদ (২২), কাউসার (২৪), কুদ্দুসকে (৪৫) আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, সেলিনা সরকারের দাদার বাবা আকলু সরকার ১৯৭০ সালে একই গ্রামের সহর উদ্দিনের কাছ থেকে ধোকড়াকুল মৌজার ৩৭ শতাংশ জমি কিনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করে আসেন। বর্তমানে সেলিনা ও তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরা পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির বৈধ ওয়ারিশ হিসেবে ভোগদখল করছেন। কিন্তু সম্প্রতি আসামিরা অসৎ উদ্দেশ্যে তাঁদের পূর্বপুরুষদের বিক্রি করা জমি নিজেদের দাবি করে তাঁদের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করেছেন।

এজাহারে আরও বলা হয়, ১২ জুন বেলা ১১টার দিকে প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁদের জমিতে এসে ঘরবাড়ি ভাঙচুর করেন। এতে তাঁদের ব্যাপক আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ সময় সেলিনার ঘরে থাকা নগদ এক লাখ টাকা ও ৭০ হাজার টাকা মূল্যের স্বর্ণের গয়না লুটপাট করে ছিনিয়ে নিয়ে যান প্রতিপক্ষের লোকজন। বাধা দিতে গেলে আসামিরা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন ও মারধরের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তাঁদের প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এতে বাদী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, দুটি পরিবারের বসতবাড়ির কিছু অবশিষ্ট নেই। ঘরের টিনের চালা ও বেড়া ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি পানি খাওয়ার নলকূপটা ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেখানে সেলিনা সরকারের বাবা সুশান্ত সরকার ও তাঁর মা আরতি ধানওয়াড় উপস্থিত ছিলেন।

সুশান্ত সরকার বলেন, তাঁর দাদা জমি কেনার পর তাঁরা খারিজ করতে গিয়ে দেখেন যে ভুলবশত সহর উদ্দিনের ভাই জফের উদ্দিন সরদারের নামে জমি রেকর্ড হয়েছে। তাঁরা রেকর্ড সংশোধনের মামলা করার কথা ভাবছিলেন। এরই মধ্যে গত বছরের অক্টোবরে জফের উদ্দিনের নাতিরা এসে জমির বাঁশ, পুকুরের মাছ ও গাছপালা কেটে নিয়ে যান। তখন তাঁরা আদালতের আশ্রয় নেন। ১২ জুন তাঁরা হামলা করে বাড়িঘর ভাঙচুর করেন।

সুশান্তের দাবি, ‘ওদের কী কাগজপত্র আছে নিয়ে আসুক। আমরাও আমাদের কাগজপত্র নিয়ে যাব। ১০ জন বসে যদি বলে, জমি ওদের ছেড়ে দিতে হবে। আমরা ছেড়ে দিয়ে চলে যাব; কিন্তু ওরা কাগজ নিয়ে আসে না। বসতেই চায় না। জোর করে দখল নিতে চায়। হামলার সময় আমার ছেলে (জরুরি সেবা নম্বর) ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ এসেছিল। তাদের থানায় ডেকেছিল। থানায় গিয়ে অভিযোগ দিয়ে আসা হয়েছে।’

সুশান্তের স্ত্রী আরতি ধানওয়াড় বলেন, ‘আমার মেয়েটা প্রতিবন্ধী। বাড়িতে একাই ছিল। রান্না করা ভাতটা পর্যন্ত সরানোর সুযোগ দেয়নি।’

এ বিষয়ে আসামিপক্ষের কারও সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে প্রধান আসামি তৈয়ব আলীর মামা সাইদুর হাসান বলেন, তিনি দুই পক্ষকেই কাগজপত্র নিয়ে বসার অনুরোধ করেছেন। কাগজপত্র দেখে যাঁর জমি, তিনি বুঝে নেবেন। তিনি এসব হানাহানির মধ্যে নেই। কিন্তু ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর তাঁরা বসতে চান না। তাঁদের কী কাগজপত্র আছে, তা-ও দেখায় না। কার নামে খাজনা দেন, তা-ও তিনি জানেন না।

পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলাম বলেন, বৃহস্পতিবার মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। ১২ জুনের ঘটনা এত দেরিতে কেন মামলা নেওয়া হলো—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওদের আসতে বলা হয়েছিল, আসেনি। এখন মামলা নেওয়া হয়েছে। ওদের পক্ষে কী কাগজপত্র আছে, আনতে বলা হয়েছে।’