চট্টগ্রামে কেন ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাচ্ছে, দিনে কত লোডশেডিং

চট্টগ্রামের রাউজানে অবস্থিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মধ্যে দুটিরই উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছেফাইল ছবি
চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস ও জ্বালানিসংকটে ২৩টি কেন্দ্রের মধ্যে বন্ধ পাঁচটি কেন্দ্র। উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে। দিনে গড়ে লোডশেডিং হচ্ছে ১৭০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট। নগরের প্রায় সব এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যায়। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ–সংকট যোগ হওয়ায় জনজীবনে ভোগান্তি বেড়েছে।

জ্বালানি তেল ও গ্যাস–সংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখা যাচ্ছে না। এ সময়ে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে পারত রাঙামাটির কর্ণফুলী বিদ্যুৎকেন্দ্র। কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্র নামে পরিচিত এ কেন্দ্রে পানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। কিন্তু গ্রীষ্মের এ মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের চারটি বন্ধ রয়েছে।

এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতা ২৪২ মেগাওয়াট। কিন্তু এখন উৎপাদন হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ মেগাওয়াট। কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, কাপ্তাই হ্রদে পানি কমে যাওয়ায় চারটি ইউনিট বন্ধ রাখা হয়েছে। বাকি একটি ইউনিট দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। বর্তমানে এতে দৈনিক ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। সব কটি ইউনিট চালু করলে কাপ্তাই হ্রদের পানি শুকিয়ে যাবে। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত হ্রদের পানির লেভেল (মিন সি লেভেল) ছিল ৭৭ দশমিক ৪৭ ফুট।

কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি বন্ধ রয়েছে। আবার যেগুলো চালু আছে, সেগুলোও সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। অধিকাংশের উৎপাদন ক্ষমতা অর্ধেকে নেমেছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড পিএলসি বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। তাদের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ২৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৮৯৮ মেগাওয়াট। যদিও গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে দিনের বেলায় ২ হাজার ১১৩ মেগাওয়াট ও সন্ধ্যায় ২ হাজার ৪০১ মেগাওয়াট।

পিডিবি ও পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম অঞ্চলের কেন্দ্রগুলোয় বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে দিনের বেলায় ২ হাজার ১১৩ মেগাওয়াট ও সন্ধ্যায় ২ হাজার ৪০১ মেগাওয়াট। এদিন চট্টগ্রামে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৫৩০ মেগাওয়াট। যদিও জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং করা হয় ২১০ মেগাওয়াট। এর আগের দিন বুধবার লোডশেডিং ছিল ১৭২ মেগাওয়াট।

গ্যাস ও জ্বালানিসংকটে বন্ধ ৫ কেন্দ্র

চট্টগ্রামের পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি চট্টগ্রাম তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র। রাউজানে অবস্থিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটির উৎপাদন সক্ষমতা ২১০ মেগাওয়াট করে। দুটি ইউনিটের মধ্যে ১ নম্বর ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। অন্য ইউনিট জাতীয় নির্বাচনের আগে চালু থাকলেও পরে গ্যাস–সংকটে বন্ধ হয়ে যায়।

এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মো. মুজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, একটি কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চালু নেই। গ্যাস না পাওয়ার কারণে অন্য ইউনিটটিও চালু করা যাচ্ছে না। গত ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

পিজিসিবি ও পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানিসংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে ৫৪ মেগাওয়াটের জোডিয়াক পাওয়ার চিটাগং লিমিটেড, ১০০ মেগাওয়াটের জুলদা–২ পাওয়ার প্ল্যান্ট, ১০০ মেগাওয়াটের জুলদা–৩ ও ১৫০ মেগাওয়াটের শিকলবাহা পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট।

গরমের তীব্রতার সঙ্গে বেড়েছে লোডশেডিং। বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরের কাজ রেখে শিশুদের হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন মা। চট্টগ্রাম নগরের ফিরিঙ্গি বাজার এলাকায়
ছবি: সৌরভ দাশ

উৎপাদন কমেছে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের

চট্টগ্রাম অঞ্চলে দুটি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সংকটে অন্য কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন যেখানে কমে এসেছিল, সেখানে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র। কিন্তু এপ্রিলের শুরুর সে স্বস্তি এখন আর নেই। এসব কেন্দ্রেও উৎপাদন কমেছে।

১ এপ্রিল মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ছিল ৯৫০ মেগাওয়াট। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। উৎপাদন সক্ষমতার ৮০ শতাংশ। এখন এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৯৩৫ মেগাওয়াট।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এস এস পাওয়ার প্ল্যান্টের উৎপাদন সরাসরি অর্ধেকে নেমেছে। ১ এপ্রিল এই কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল ১ হাজার ১৭০ মেগাওয়াট। ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সেদিন ৯৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়েছিল।

তবে এখন কয়লা সংকটের কারণে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে ৬১২ মেগাওয়াট, যা উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেক। জ্বালানিসংকটের কারণে অন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না।

পিডিবি ও পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম অঞ্চলের কেন্দ্রগুলোয় বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে দিনের বেলায় ২ হাজার ১১৩ মেগাওয়াট ও সন্ধ্যায় ২ হাজার ৪০১ মেগাওয়াট। এদিন চট্টগ্রামে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৫৩০ মেগাওয়াট। যদিও জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং করা হয় ২১০ মেগাওয়াট। এর আগের দিন বুধবার লোডশেডিং ছিল ১৭২ মেগাওয়াট।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি একই রকম রয়েছে। এর মধ্যে কারিগরি ত্রুটির কারণে আদানির একটি ইউনিট থেকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। গরমে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে।

‘আসতে সময় লাগে, যেতে নয়’

লোডশেডিংয়ের কারণে দুর্বিষহ অবস্থায় আছে শহর ও গ্রামের মানুষ। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুতের বারবার আসা–যাওয়ায় বৃদ্ধ ও শিশুরা কষ্টে আছে। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বিদ্যুৎ–বিভ্রাটে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটছে। বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ব্যবসা–বাণিজ্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন দোকানিরা।

সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভালো ছিল না। চট্টগ্রাম নগরের নয়াহাট এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন গৃহিণী খাদিজা বেগম। বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলপড়ুয়া দুই ছেলে ও স্বামী নিয়ে সংসার।

গতকাল দিন–রাত মিলিয়ে অন্তত ১০ বার বিদ্যুৎ গেছে বলে জানান খাদিজা বেগম। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এখন বিদ্যুৎ আসতে সময় লাগে। যেতে সময় লাগে না। সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকি, কখন কারেন্ট (বিদ্যুৎ) যায়। বারবার যাওয়ার কারণে গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছি। হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে হাত ব্যথা হয়ে গেছে। গরমের কারণে বমিও হয়েছে। ছেলে দুটি পড়তে পারছে না। ঘুমাতেও পারছে না।’

শিশুসন্তান নিয়ে কষ্টের কথা জানান চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ইছাখালি ইউনিয়নের হাসনাবাদ এলাকার বাসিন্দা গৃহবধূ আকলিমা আক্তার। তিনি বলেন, এখানে বিদ্যুৎ আসে আর যায়। এক ঘণ্টা থাকলে আরেক ঘণ্টা থাকে না। দিনে ১৫ থেকে ২০ বার বিদ্যুৎ যায় আসে। সারা দিন মিলে ১২ ঘণ্টাও থাকে না। বিদ্যুৎ না থাকলে প্রচণ্ড গরমে শিশুদের বেশি কষ্ট হচ্ছে।

একই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের পশ্চিম সোনাই এলাকার বাসিন্দা জামাল হোসেন বলেন, ‘আমরা উপজেলার সবচেয়ে প্রান্তিক এলাকায় বসবাস করি। পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এখানে রাতের বেলায় কিছু সময়ের জন্য বিদ্যুৎ থাকলেও দিনের বেলায় বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। একবার গেলে টানা চার ঘণ্টায়ও বিদ্যুৎ আসে না।’