কক্সবাজারে করার কিছু নেই, সন্ধ্যাটা জমিয়ে দিতে পারে গানের আসর
সকালে সমুদ্রে গা ভাসানো, বিকেলে সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখা—কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদের চেনা রুটিন। বিনোদনের সুযোগ কম থাকায় সন্ধ্যার পর অনেকেই হোটেলে ফিরে যান অথবা ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করে বাড়ি ফিরে যান। তবে এখন এই দিন পাল্টাচ্ছে। কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে সন্ধ্যার পর বসছে গানের আসর।
কক্সবাজার শহর ও মেরিন ড্রাইভের কয়েকটি হোটেল-রিসোর্টে এমন দৃশ্য দেখা যায়। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব হোটেলে চলে সাংস্কৃতিক আয়োজন। সেখানে গান শুনতে ও খাবার খেতে জড়ো হন দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা।
হোটেলগুলোর মধ্যে লাবণী পয়েন্টের হোটেল কল্লোল ও মেরিন ড্রাইভের প্যাঁচার দ্বীপের মারমেইড বিচ রিসোর্টে পর্যটকদের সমাগম বেশি। এ ছাড়া আরও কয়েকটি তারকা হোটেলে নিয়মিত লাইভ মিউজিকের আয়োজন করা হয়।
কল্লোলের আঙিনায় সুরের আসর
লাবণী সৈকতের মূল পয়েন্টে হোটেল কল্লোলের আঙিনায় গত সাত বছর ধরে প্রতিদিন সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি সেখানে বিভিন্ন ধরনের খাবারের আয়োজনও থাকে। হোটেলটিতে ১৪০টি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ রয়েছে। কক্ষগুলো থেকে সমুদ্র ও সূর্যাস্ত দেখা যায়।
কল্লোলের সাংস্কৃতিক আয়োজনের বিশেষত্ব এর মঞ্চ। হোটেলের আঙিনার উত্তর কোণে কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী সাম্পানের আদলে তৈরি করা হয়েছে এটি। সেখানে স্থানীয় শিল্পীরা লোকসংগীত ও আধুনিক গান পরিবেশন করেন।
মঞ্চের সামনে খোলা মাঠে কয়েক শ চেয়ার রাখা হয়। পাশের সুইমিংপুলের কাছেও দাঁড়িয়ে গান শোনেন অনেকে। সাততলা হোটেলের কক্ষের বারান্দা থেকেও কেউ কেউ এই আয়োজন উপভোগ করেন।
সম্প্রতি এক সন্ধ্যায় হোটেল কল্লোলের আঙিনায় কথা হয় ঢাকার শ্যামলীর ব্যবসায়ী নজিবুল ইসলামের সঙ্গে। তিন দিনের ছুটিতে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে এসেছেন তিনি। সন্ধ্যায় সাজানো টেবিলে বসে খাবার খাওয়ার পাশাপাশি গান শুনছিলেন নজিবুল।
‘কল্লোল ও মারমেইডের মতো অনেক প্রতিষ্ঠান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে আগ্রহী। কিন্তু অধিকাংশ হোটেলে খোলা জায়গা নেই। যাদের আছে, তাঁরাও নানা কারণে অনুষ্ঠান করতে পারছেন না।’
নজিবুল ইসলাম (৪২) বলেন, ‘কক্সবাজারে দিনে ঘোরার অনেক জায়গা আছে; কিন্তু সন্ধ্যা হলেই যেন সময় কাটতে চায় না। কল্লোলের এই আয়োজন আমাদের ভ্রমণে আমেজ বদলে দিয়েছে।’
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাসরিন সুলতানা বলেন, ‘খোলা আকাশের নিচে কল্লোলের মতো এমন আয়োজন কক্সবাজার শহরে আর কোথাও দেখা যায় না। আগে তারকা হোটেলগুলোর একটিতে সিনেমা দেখানো হতো, এখন বন্ধ। শহরে সিনেমা হলও সব কটি বন্ধ।’
হোটেল কল্লোল পরিচালনা করে জে অ্যান্ড জেড গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান প্রথম আলোকে বলেন, সমুদ্রের টানে ছুটে আসা পর্যটকদের রাত্রিকালীন বিনোদনের তেমন কিছু কক্সবাজারে গড়ে ওঠেনি। পর্যটকদের চাহিদা পূরণ এবং কক্সবাজারকে প্রতিনিধিত্ব করতে কয়েক বছর ধরে হোটেলের আঙিনায় সন্ধ্যাকালীন সংগীতের আয়োজন করা হচ্ছে। বিনা মূল্যে পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও আসরে যোগ দিয়ে বিনোদন উপভোগের সুযোগ পান।
হোটেল কল্লোলের মহাব্যবস্থাপক মো. হাবিবুল বাশার বলেন, প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত সাম্পান মঞ্চে শিল্পীদের গান চলে। সবার জন্য এটি উন্মুক্ত।
বছরজুড়ে আয়োজন মারমেইডে
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের প্যাঁচার দ্বীপ সৈকতে গড়ে উঠেছে ইকোট্যুরিজম প্রতিষ্ঠান মারমেইড বিচ রিসোর্ট। এটিতে সাধারণত বিদেশি পর্যটকের সমাগম বেশি। অতিথিদের বিনোদনের জন্য এতে বছরজুড়ে দেশি-বিদেশি শিল্পীদের নিয়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হয়।
রিসোর্টটির আয়োজনের মধ্যে থার্টি ফার্স্ট নাইট ও তিন দিনব্যাপী বার্নিং ক্র্যাব ফেস্টিভ্যাল অন্যতম। এসব আয়োজন দেখতে জাপান, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটকেরা আসেন। চলতি বছর জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ফেস্টিভ্যালে ১১ দেশের চার শতাধিক পর্যটক উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া প্রতি মাসে দুইবার উন্মুক্ত সৈকতে ‘সান সেট ও মুন ইটিং পার্টি’র আয়োজন করা হয়। ডিম্বাকৃতির মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিদেশি শিল্পীরা ‘ডিজে’ পরিবেশন করেন।
বার্নিং ক্র্যাব ফেস্টিভ্যালের জন্য সৈকতে লাল কাঁকড়ার আকৃতির মঞ্চ তৈরি করা হয়। সেখানে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজারের ম্রো, মারমা, ত্রিপুরা, চাকমা, পাংখোয়া ও রাখাইনসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের তরুণীরা নাচ পরিবেশন করেন। ছাতানৃত্য, বোতলনৃত্য, জুমনৃত্য, বাঁশনৃত্য ও প্রদীপনৃত্য দর্শকদের আকর্ষণ করে। এ ছাড়া বাউলদের গানের আসর ও চলচ্চিত্র উৎসবেরও আয়োজন করা হয়।
মারমেইড ইকোট্যুরিজম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিসুল হক চৌধুরী বলেন, বিদেশি পর্যটকেরা সমুদ্রতীরে নিরিবিলি পরিবেশে আনন্দ-উল্লাস করতে পছন্দ করেন। কক্সবাজারের পর্যটনকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে এসব আয়োজন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল্যাক রক সিটির বার্নিং ম্যান প্রজেক্টের আদলে মারমেইড বিচ রিসোর্টের আয়োজন সাজানো হয়। নাচগানের পাশাপাশি ফায়ার শোসহ নানা অ্যাক্টিভিটি দর্শকদের মাতিয়ে রাখে।
আরও যেসব হোটেলে আয়োজন
কলাতলীর হোটেল সায়মান বিচ রিসোর্টের নিচতলায় অতিথিদের বসার জায়গায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় গান পরিবেশন করেন স্থানীয় কয়েকজন শিল্পী। গিটার ও তবলার সঙ্গে গান পরিবেশন করা হয়।
রিসোর্টের ব্যবস্থাপক সরওয়ার আলম বলেন, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত এই আসর বসে। দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা স্থানীয় লোকসংগীত উপভোগ করেন।
পাশের আরেক তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের লবিতেও সন্ধ্যায় লাইভ মিউজিকের আয়োজন করা হয়। হোটেলটির জনসংযোগ কর্মকর্তা সায়ীদ আলমগীর বলেন, সারা দিন সাগর দেখা ও ঘোরাঘুরি শেষে পর্যটকেরা সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে আসেন। এ সময় অতিথিরা লবিতে বসে গান উপভোগ করেন। প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত তিন শিল্পী ম্যান্ডোলিন ও তবলার সংমিশ্রণে গান পরিবেশন করেন।
এ ছাড়া হোটেল কক্স টুডে, লং বিচ হোটেল, প্রাসাদ প্যারাডাইস ও সি প্যালেস হোটেলসহ শহরের কয়েকটি হোটেলেও পর্যটকনির্ভর সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়।
কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, আগে সমুদ্রসৈকতে ‘আদিবাসী মেলা’, ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ উৎসব, ঘুড়ি উৎসব, ‘বালু ভাস্কর্য’ উৎসব, ‘বিচ কার্নিভ্যাল’ ও ‘বিচ’ ভলিবলসহ বিভিন্ন লাইভ কনসার্টের আয়োজন করা হতো। নিরাপত্তার অজুহাতে এক যুগ ধরে উন্মুক্ত পরিবেশের এসব আয়োজন বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে হোটেল কল্লোল ও মারমেইড বিচ রিসোর্ট ব্যতিক্রম। তারা বছরজুড়ে উন্মুক্ত স্থানে সংগীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পর্যটকদের ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
মুকিম খান বলেন, কল্লোল ও মারমেইডের মতো অনেক প্রতিষ্ঠান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে আগ্রহী; কিন্তু অধিকাংশ হোটেলে খোলা জায়গা নেই। যাদের আছে, তারাও নানা কারণে অনুষ্ঠান করতে পারছে না।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুল শুক্কুর বলেন, থাইল্যান্ডের ফুকেট-পাতায়া, মালয়েশিয়ার লংকাউই, ভারতের গোয়া, ইন্দোনেশিয়ার বালি, নেপাল ও ভুটানসহ বিশ্বের জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যগুলোতে রাতের বিনোদন ও লাইভ মিউজিক থাকে। বিদেশি পর্যটক টানতে কক্সবাজারেও রাত্রিকালীন বিনোদন বাড়াতে বিনিয়োগ দরকার।