পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়াও যেখানে পরীক্ষার অংশ

শিক্ষার্থীদের পাঠচর্চার জন্য সাজানো হয়েছে বিদ্যালয়ের পাঠাগার। ৩১ জুলাই দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের ভুঁইয়ারবাগ এলাকায় বিদ্যানিকেতন হাইস্কুলের পাঠাগারেছবি: প্রথম আলো

স্কুলের প্রধান ফটক পেরিয়ে একটু এগোলেই ভবনের নিচতলায় একটি বড় কক্ষ। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সেই কক্ষে ঢুকতেই দেখা যায় চারপাশে সারি সারি বইয়ের তাক। সেখানে সাজানো হাজারো বই।

বাইরে তখন স্কুলের ক্লাস চলছে। এর মধ্যে পাঠাগারের ভেতরে কয়েক ডজন শিক্ষার্থী বসে আছে বই নিয়ে। কেউ ডুবে আছে কিশোর উপন্যাসে, কেউ বিজ্ঞানের বইয়ে, কেউ আবার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ছে।

এই দৃশ্য নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের ভুঁইয়ারবাগ এলাকার বিদ্যানিকেতন হাইস্কুলের পাঠাগারের। এই বিদ্যালয়ে বই পড়া শুধু অবসর কাটানোর বিষয় নয়, পরীক্ষারও অংশ। পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়া বইয়ের ওপর ৫০ নম্বরের পরীক্ষা হয়। সেই পরীক্ষায় পাস না করলে বার্ষিক পরীক্ষাতেও পাস করা যায় না।

প্রায় দুই দশক ধরে এভাবেই শিক্ষার্থীদের বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করানোর চেষ্টা করছে বিদ্যালয়টি। ২০০৭ সালে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শুরু হয় পাঠাগারের জন্য বই সংগ্রহ। সময়ের সঙ্গে সেই সংগ্রহ বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ হাজারে।

বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থী প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন। শিক্ষক-শিক্ষিকা ৬২ জন ও কর্মচারী ১০ জন। পাঠাগারটিতে রয়েছে আটটি পাঠের টেবিল। প্রতিটি টেবিলে ছয়জন করে বসতে পারে। পুরো কক্ষ সিসিটিভির আওতায়। সপ্তাহের নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সেখানে এসে বই পড়ে।

বইয়ের ভেতর দিয়ে অন্য এক জগৎ

পাঠাগারে বইয়ের বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। শিশুতোষ গল্প, কবিতা, উপন্যাস, বিজ্ঞান, ইতিহাস, জীবনী, ধর্মীয় বই, রূপকথা ও গোয়েন্দা কাহিনির পাশাপাশি আছে দেশ-বিদেশের নানা বিষয়ের বই। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নির্বাচিত বইয়েরও রয়েছে সমৃদ্ধ সংগ্রহ।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০। দুটি তাকজুড়ে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের বই। পাশাপাশি হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আনিসুল হক, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা আলী, মীর মশাররফ হোসেন, আবদুল্লাহ আল-মুতি, রফিউর রাব্বি, ডেল কার্নেগি, নেলসন ম্যান্ডেলা, জুল ভার্নসহ দেশি-বিদেশি বহু লেখকের বই রয়েছে।

বইপাঠে মগ্ন শিক্ষার্থীরা। ৩১ জুলাই দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের ভুঁইয়ারবাগ এলাকায় বিদ্যানিকেতন হাইস্কুলের পাঠাগারে
ছবি: প্রথম আলো

তবে এই পাঠাগারের বিশেষত্ব শুধু বইয়ের সংখ্যা নয়, বই পড়াকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করার আয়োজনটিই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বছরের ৫২ সপ্তাহজুড়েই শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়তে হয়। বছরে অন্তত চারটি বই পড়া বাধ্যতামূলক। সেই বইগুলোর ওপরই নেওয়া হয় ৫০ নম্বরের পরীক্ষা।

শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই যেন বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে, সে লক্ষ্যেই এ ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, বই পড়া পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকায় শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বই পড়ে। অনেকে আবার বাধ্যতামূলক চারটি বইয়ের বাইরেও নিজেদের আগ্রহে আরও বই পড়ে।

শিক্ষার্থীদের যেন বইপাঠের উৎসব চলছে। ৩১ জুলাই দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের ভুঁইয়ারবাগ এলাকায় বিদ্যানিকেতন হাইস্কুলের পাঠাগারে
ছবি: প্রথম আলো

৪টি থেকে বেড়ে ১০–১২টি বই

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতেমাতুজ জোহরা বলে, ‘সপ্তাহে এক দিন ক্লাসের সময় আমাদের লাইব্রেরিতে নির্দিষ্ট লেখকের বই পড়তে হয়। আগে বছরে চারটি বই পড়ার কথা ভাবতাম। এখন গল্প-উপন্যাস ভালো লাগায় ১০-১২টি বই পড়ে ফেলি।’

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী লাবনী আক্তারের পছন্দ বিজ্ঞান ও গল্পের বই। ষষ্ঠ শ্রেণির দিয়া সাহার গল্পের বই বেশি পছন্দ। তার ভাষায়, ‘লাইব্রেরিতে অনেক মজার মজার গল্পের বই আছে। সেগুলো পড়তে আমার খুব ভালো লাগে।’

ছোটদের মধ্যে হাসির গল্প, ভূতের গল্প, গোয়েন্দা কাহিনি ও বিজ্ঞানের বইয়ের চাহিদা বেশি। প্রতিটি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে আলাদা বই নির্বাচন করা হয়েছে বলে জানান সহকারী লাইব্রেরিয়ান বিবি হাওয়া।

প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০টি বই ইস্যু হয় জানিয়ে সহকারী লাইব্রেরিয়ান মো. রাইসুল ইসলাম খান বলেন, শিক্ষার্থীরা বেতন কার্ড জমা দিয়ে এক সপ্তাহের জন্য বই বাড়িতে নিতে পারে। বছরে ১০ থেকে ১২ হাজার বই শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়।

পাঠাগারে বই বেছে নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা
ছবি: প্রথম আলো

বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব

পরীক্ষায় ভালো ফল করার পাশাপাশি সচেতন ও মানবিক মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠতে বই পড়ার বিকল্প নেই মন্তব্য করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক কাকলী আক্তার।

প্রতি সপ্তাহে প্রতিটি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ে পাঠাগারে আনা হয় বলে জানান বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উত্তম কুমার। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা বই হাতে নিক, বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করুক। বই নাড়াচাড়া করতে করতে একসময় তাদের ভেতরে পড়ার আগ্রহ তৈরি হোক।’

বিদ্যানিকেতন হাইস্কুলের পাঠাগার সমৃদ্ধ উল্লেখ করে নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি প্রথম আলোকে বলেন, পাঠ্যবইয়ের বাইরে এসব বই পড়ার সুযোগ শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াবে। এই পাঠাভ্যাস তাদের আলোকিত, মানবিক ও চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করবে।

মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সময়ে শিশু-কিশোরদের বই থেকে দূরে সরে যাওয়ার কথা প্রায়ই শোনা যায়। এর মধ্যেও বিদ্যানিকেতন হাইস্কুল যেন ভিন্ন একটি পথ দেখাচ্ছে। এখানে বই পড়া কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, শিক্ষারই অংশ। প্রায় দুই দশকে গড়ে ওঠা ১৭ হাজার বইয়ের এই ভান্ডারে তাই শুধু বই জমছে না, তৈরি হচ্ছে পাঠকও।