মা গৃহপরিচারিকা, থাকেন ভাড়া বাসায়, স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় আটকে গেল শিক্ষক পদে নিয়োগ
মিশন আচার্য (৩০) ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকায় ভাড়া বাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকেন। মা ময়না আচার্য গৃহপরিচারিকার কাজ করে তাঁকে পড়ালেখা করিয়েছেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেন মিশন আচার্য। নিয়োগের সুপারিশপ্রাপ্তও হয়েছেন তিনি। কিন্তু নিজেদের কোনো ভিটেবাড়ি না থাকায় নিয়োগপত্র পাচ্ছেন না। এই নিয়োগপত্রের আশায় সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ঘুরছেন তিনি।
মিশন আচার্য জানান, তাঁর সঙ্গে যে ১৮২ জন সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ১৮০ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। দুজন নিয়োগপত্র পাননি, যাঁদের একজনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। আর তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে স্থায়ী ঠিকানা না পেয়ে। স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় চাকরির আবেদনে ভাড়া বাসার ঠিকানা দিয়েছিলেন তিনি।
গতকাল বুধবার সকালে জেলা শিক্ষা অফিসের সামনে কথা হয় মিশন আচার্যের সঙ্গে। তিনি বলেন, তাঁরা দুই ভাই। বড় ভাই শৈলেন আচার্য অন্যের সঙ্গে ভাগে কাপড়ের ব্যবসা করেন। বাবা নন্দ আচার্যের বাড়ি ছিল যশোর। তাঁর মা ময়না আচার্যের সঙ্গে বিয়ের পর ঝিনাইদহে থাকতেন। মাকে কখনো যশোর নিয়ে যাননি। ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগানে ভাড়া বাড়িতে ছিল তাঁদের সংসার। মায়ের কাছ থেকে তিনি যতটুকু শুনেছেন, ঝিনাইদহে থাকা অবস্থায় তাঁর বড় ভাইয়ের জন্ম হয়। তিনি মায়ের গর্ভে এলে বাবা বাড়ি ছেড়ে চলে যান, আর কখনো ফিরে আসেননি।
মিশন আচার্য বলেন, বাবা চলে যাওয়ার পর মা অসহায় হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় তিনি অন্যের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ শুরু করেন। এভাবেই তাঁদের দুই ভাইকে বড় করেছেন। বড় ভাই সংসারের চাপে বেশি পড়ালেখা করতে পারেননি।
তবে মিশন আচার্য এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেলে মায়ের কষ্ট হলেও তাঁকে পড়ালেখা করিয়েছেন। এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪ দশমিক ৮৩ পেয়ে পাস করেন। এরপর ভর্তি হন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর করেন।
মিশন আচার্য জানান, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় তিনি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, জেলা প্রশাসকের দপ্তরে খোঁজ নিতে গেলে তাঁকে জানানো হয়েছে তাঁর কোনো স্থায়ী ঠিকানা পাওয়া যায়নি। তাই তাঁকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি।
ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকায় বড় হয়েছেন মিশন আচার্য। সেখানে শহিদুল ইসলামের বাড়িতে ভাড়া থাকেন। তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা কলাবাগান। তাঁর সব শিক্ষাসনদে কলাবাগানের ঠিকানা রয়েছে। চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর তাঁর এই বাসায় গিয়ে পুলিশি যাচাইও করা হয়। তারপরেও তাঁকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি।
মিশন আচার্য বলেন, তাঁর নানা বাড়ি সদর উপজেলার পণ্ডিতপুর গ্রামে। সেখানে তাঁর বাবা কিছুদিন ছিলেন। তাঁদের কোনো ভিটেবাড়ি না থাকায় এক মামা বিষ্ণুপদ বিশ্বাস সেই পণ্ডিতপুরে বাড়ি করার জন্য ২০২২ সালে তাঁকে দুই শতক জমিও দিয়েছেন। কিন্তু বাড়ি করা সম্ভব হয়নি। ইচ্ছা ছিল চাকরি পাওয়ার পর সেখানে বাড়ি করে পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকবেন।
মহেশপুর উপজেলার ন্যাপা এলাকার বাসিন্দা জিহাদ হোসেন। মিশন আচার্য ও তিনি একসঙ্গে চাকরির পরীক্ষা দিয়েছিলেন। জিহাদ নিয়োগপত্র পেয়েছেন। বললেন, মিশন আচার্যের নিয়োগপত্র না পাওয়ার কথা শুনে খুব খারাপ লাগে। তাঁরা কয়েকজন বন্ধু মিলে শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাঁদের বলা হয়েছে, এটা অধিদপ্তর থেকে সমাধান হতে হবে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেন জানান, মিশন আচার্য ও তাঁর বন্ধুরা এসে অভিযোগ দেওয়ার পর তিনি ব্যবস্থা নিয়েছেন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। দ্রুত একটা সমাধান হবে বলে আশা করছেন।
মিশন আচার্যের বড় ভাই শৈলেন আচার্য বলেন, তাঁদের জীবন কেটেছে অতি কষ্টে। এর মধ্যেও তাঁর ভাই পড়ালেখা করেছেন। এখন বাড়িঘর না থাকায় চাকরি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও নিয়োগপত্র পাচ্ছেন না।
বিষয়টি নজরে আনলে জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, মিশন আচার্যের নিয়োগের বিষয়ে স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে একটি জটিলতা দেখা দিয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে ইতিমধ্যে বিষয়টি লিখিতভাবে শিক্ষা অধিদপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে। আশা করছেন, একটা সমাধান হবে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে ‘ভূমিহীন’ বলে পুলিশে চাকরি আটকে গিয়েছিল বরিশালের কলেজছাত্রী আসপিয়া ইসলামের। তবে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার পর তখন পুলিশের ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) পদে চাকরি হয় তাঁর।