দুই বছরেও ভবন বুঝে নেয়নি কেউ, চুরি যাচ্ছে জিনিসপত্র

রাজশাহী নগরের লক্ষ্মফুর টিবিপুকুর এলাকায় নির্মিত ২০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতালছবি: প্রথম আলো

রাজশাহী শিশু হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল এক দশক আগে। শেষ হয়েছে দুই বছরের বেশি সময় আগে। কিন্তু ২০০ শয্যার হাসপাতালটি স্বাস্থ্য বিভাগ এখনো বুঝে না নেওয়ায় সেবা কার্যক্রম শুরু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকায় হাসপাতালের বিভিন্ন জিনিসপত্র চুরি হয়ে যাচ্ছে।

সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় ২০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতালের অবকাঠামো পড়ে থাকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

‘কনস্ট্রাকশন অব গভর্নমেন্ট শিশু হসপিটাল অ্যাট রাজশাহী সিটি করপোরেশন’ শিরোনামের প্রকল্পের আওতায় শিশু হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণকাজটি পায় ‘কেএসবিএল অ্যান্ড এইচই (জেভি)’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। মূল কাজ তিন বছরেই শেষ হয়ে যায়। এরপর আরও কিছু বাড়তি কাজ দেওয়া হয়েছিল। সেগুলোও ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে শেষ করে প্রতিষ্ঠানটি। একই বছরের ৩০ অক্টোবর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর ভবনটি হস্তান্তরের জন্য চিঠি দেওয়া হয়। বারবার চিঠি দিলেও কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটি বুঝে নিচ্ছে না। ঠিকাদার নিজেদের লোক দিয়ে প্রায় পাঁচ বছর ধরে হাসপাতালটি পাহারা দিচ্ছেন।

আরও পড়ুন

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তারা ওই বছর ১৪ আগস্ট, ২৮ আগস্ট ও ৪ সেপ্টেম্বর লিখিত ও মৌখিকভাবে ভবনটি হস্তান্তর করার কথা জানিয়েছেন। ৩ সেপ্টেম্বর ভবনের পশ্চিম ব্লকের দুটি জানালার কাচ ভেঙে অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম এবং ২৫ অক্টোবর গভীর নলকূপের কেব্‌ল চুরি গেছে। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাজপাড়া থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। আগামী দিনে এর থেকে বেশি চুরি হওয়ার আশঙ্কা আছে। এরপর কোনো ক্ষতি হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই দায়ভার নেবে না।

সম্প্রতি নগরের লক্ষ্মীপুর টিবিপুকুর এলাকায় নির্মিত ওই হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে শুধু ঠিকাদারের একজন কর্মচারী পাহারায় আছেন। তিনি বলেন, বাইরের সব ফিটিংস রাতের বেলা চুরি হয়ে যাচ্ছে। ওই কর্মচারীর সঙ্গে হাসপাতাল ভবনের পেছনে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে। পাওয়ার কেব্‌লও নেই। পাহারাদার বলেন, এগুলোতে বাল্ব লাগানো ছিল। সব চুরি হয়ে গেছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চারতলাবিশিষ্ট হাসপাতাল ভবনে নিউনেটাল আইসিইউ (এনআইসিইউ) শয্যা রয়েছে ৫২টি। এ ছাড়া ৯৬টি সাধারণ শয্যাসহ মোট ২০০ শয্যা রয়েছে। কনসালট্যান্টদের জন্য ১৪টি কক্ষ রয়েছে। এ ছাড়া সিটি স্ক্যান, এমআরআই, আলট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রে ও ইসিজির জন্য একটি করে কক্ষ রয়েছে।

রাজশাহী নগরের লক্ষ্মফুর টিবিপুকুর এলাকায় নির্মিত ২০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতাল
ছবি: প্রথম আলো

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী ফরহাদ সরকার প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতাল ভবন তাঁদের পক্ষে আর পাহারা দিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাঁরা কিছু বলতে গেলেই গ্লাস ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে। ফ্রেম খুলে নিয়ে যাচ্ছে। তাঁরা হাসপাতাল ভবনটি বুঝে নিতে বারবার চিঠি দিচ্ছেন; কিন্তু কর্তৃপক্ষ সাড়া দিচ্ছে না।

হাসপাতাল বুঝে না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. কাউসার সরকার বলেন, ‘সমস্যা আমাদের না। সমস্যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। হাসপাতালের পক্ষে কে বুঝে নেবে, এটা ঠিকই হয়নি। হাসপাতালের আদারস লজিস্টিক ও অর্গানোগ্রাম নেই। আমরা তো কাজ শেষ করে দিয়েছি। এটা সিভিল সার্জনের বুঝে নেওয়ার কথা। তিনি কেন বুঝে নিচ্ছেন না?’ তিনি বলেন, বাইরের ফিটিংস বা জানালার গ্লাস ভাঙা ছিল, তা ওইভাবেই আছে। হস্তান্তরপ্রক্রিয়া শুরু হলে ঠিক করে দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

সাবেক সিভিল সার্জন আবু সাইদ মোহাম্মদ ফারুক গত বছর প্রথম আলোকে বলেছিলেন, তাঁরা বারবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু ৫ আগস্টের পর থেকে কোনো সাড়া পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, তাঁরও বদলি হয়ে গেছে। এ বিষয়ে তিনি আর কিছু বলতে পারবেন না।

বর্তমান সিভিল সার্জন এস আই এম রাজিউল করিম কয়েক দিন আগে প্রথম আলোকে বলেন, এ ব্যাপারে তাঁদের কিছু বলার নেই। তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজের পরিচালকের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের পরিচালক পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম বলেন, এটা হাসপাতালের পরিচালকের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা হয়েছিল মাত্র।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী জেলা কমিটির সভাপতি আহমেদ শফি উদ্দিন বলেন, একটি হাসপাতালের জন্য জনগণের অর্থ ব্যয় তখনই সফল হয়, যখন এটা জনগণের কাজে লাগে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে নির্মাণ করা হাসপাতাল ফেলে রাখা হয়েছে। এক ঘণ্টার জন্যও বিলম্ব করা তো অপরাধ।

আরও পড়ুন