বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে শখের ছাদবাগান, বছরে আয় চার লাখ

নিজের ক্যাকটাস বাগানে ফরমান হাসনাত। সম্প্রতি তোলাছবি: প্রথম আলো

ইট বিছানো সরু সড়কের এক পাশে ধানখেত, আরেক পাশে বসতঘর। সেই সড়ক দিয়ে খানিকক্ষণ হাঁটলেই টিনের একটি বাড়ি। এতে ঢুকতেই বাঁ দিকের পুকুরপাড়ে দেখা মেলে দুটি শেড। পদ্ম থেকে ক্যাকটাস—সব উদ্ভিদের সমারোহ সেখানে।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের কাদেরিয়া পাড়ায় দেখা যায় এ দৃশ্যের। দেখতে শৌখিন এ ছাদবাগানটি করেছেন ফরমান হাসনাত নামের এক যুবক। তিনি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারবিজ্ঞান অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন প্রকৌশল বিভাগ থেকে পাস করেছেন। এখন তিনি এই ছাদবাগান থেকেই বছরে আয় করেন অন্তত চার লাখ টাকা। সেখানে রয়েছে ৪৬০ প্রজাতির বিভিন্ন গাছ।

ক্যাকটাসের বংশবৃদ্ধির জন্য গ্রাফটিং থেকে শুরু করে শেড তৈরি-সবই নিজের হাতে করেছি। ক্যাকটাসের চরিত্র আলাদা। গাছে সার দিলেই দ্রুত বড় হয় না। গুগলে প্রতিবেদন পড়েছি, ইউটিউব ভিডিও দেখেছি। সেখান থেকেই শিখেছি। এখন পৃথিবীর অন্তত ৫০টি দেশের উদ্ভিদ আমার সংগ্রহে রয়েছে।
ফরমান হাসনাত

ফরমান হাসনাত বর্তমানে পেকুয়া চৌমুহনীতে বন্ধুদের সঙ্গে একটি কোচিং সেন্টারে পড়ান। পড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত সময় দেন নিজের বাগানে। তাঁর বাবা জাকের হোসাইন কৃষক, মা গৃহিণী। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ভাই আবু সৈয়দ সৌদি আরবে কর্মরত। ছোট ভাই আরফাতুল ইসলাম দশম শ্রেণির ছাত্র। পড়াশোনার ফাঁকে বাগান পরিচর্যায় ফরমানকে সহযোগিতা করে সে।

ফরমান হাসনাতের বাগানটি যেন বিরল উদ্ভিদের এক সংগ্রহশালা। ৪৬০ প্রজাতির মধ্যে অন্তত দেড় শ প্রজাতিই ক্যাকটাস। সে কারণেই বাগানের নাম দিয়েছেন ‘পেকুয়া ক্যাকটাস গার্ডেন’। সেনসোভেরিয়া, হাউয়ার্থিয়া, এলয়, ইউফোর্বিয়া, পর্তুলিকা, স্টেফেলিয়া, ক্যালাঞ্চু, সিডাম, লিলি, সাকুলেন্ট, ক্যালাডিয়াম, জেড জেড প্ল্যান্ট, পাথোস, এগ্লেনিমা, এয়ার প্ল্যান্ট, অর্কিড, হয়া, ওয়াটার প্ল্যান্ট, ক্রিপথ্যান্থাস ও পদ্মের একাধিক প্রজাতির গাছ তাঁর বাগানে রয়েছে। এ ছাড়া শতাধিক একক প্রজাতির উদ্ভিদও আছে।

আকার ও জাতভেদে ক্যাকটাস তিনি ৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। আর ফার্ন ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা এবং স্টেফেনিয়া ১৫০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত দাম নেন।

সম্প্রতি ছাদবাগানটিতে গিয়ে কথা হয় ফরমানের সঙ্গে। তখন পাশে ছিল তাঁর ছোট ভাই আরফাতুল। কাজের ফাঁকে নিজের শুরুর গল্প শুনিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই বাগানের প্রতি টান ছিল। শখের বশে চারা লাগাতাম। করোনার মহামারির শেষ দিকে ক্যাকটাস ও বিরল উদ্ভিদ সংগ্রহ শুরু করি। নোয়াখালীর একটি নার্সারি থেকে ক্যাকটাস কিনে নিজের কক্ষের রাখি। কিন্তু পরিচর্যা ঠিক না হওয়ায় কিছু গাছ পচে যায়। পরে অনলাইনে অর্ডার করে প্রতারণার শিকারও হই। শুরুটা খুবই নেতিবাচক থাকলেও হাল ছাড়িনি।’

শুরুর দিকে প্রতারণার শিকার হলেও বাগান করেন এমন বিভিন্ন দলে পরে যুক্ত হন ফরমান। সেখান থেকেই ক্যাকটাস, অর্কিড, ফার্ন, স্টেফেলিয়া, স্টেফেনিয়া, হাওয়ার্থিয়া, গ্যাস্টেরিয়া, এয়ার প্ল্যান্ট, সেনসোভেরিয়া, এলয়, আইস প্ল্যান্ট, বেবি টিয়ারস, নাইট কুইনসহ নানা প্রজাতির উদ্ভিদ সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর এসব উদ্ভিদে বাড়ির পুকুরপাড়ে ছোট পরিসরে বাগান গড়ে তোলেন। এখনো নতুন কোনো গাছের খোঁজ পেলে তা সংগ্রহে আনেন।

ফরমান হাসনাতের বাগানটি যেন বিরল উদ্ভিদের এক সংগ্রহশালা। এটি অবস্থিত কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের কাদেরিয়া পাড়ায়
ছবি: প্রথম আলো

ফরমান বলেন, ‘ক্যাকটাসের বংশবৃদ্ধির জন্য গ্রাফটিং থেকে শুরু করে শেড তৈরি—সবই নিজের হাতে করেছি। ক্যাকটাসের চরিত্র আলাদা। গাছে সার দিলেই দ্রুত বড় হয় না। গুগলে প্রতিবেদন পড়েছি, ইউটিউব ভিডিও দেখেছি। সেখান থেকেই শিখেছি। এখন পৃথিবীর অন্তত ৫০টি দেশের উদ্ভিদ আমার সংগ্রহে রয়েছে।’

এই বাগান থেকেই এখন সারা দেশে চারা পাঠান ফরমান। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে চলতি ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ৬০৯টি গাছের কুরিয়ার পাঠিয়েছেন তিনি। গড় হিসাবে প্রতি মাসে তাঁর আয় হয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। তাঁর মতে, আর একটু সময় দিলে মাসে ৫০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। তাঁর বাগানে পাঁচ হাজার টাকা দামের চারাও রয়েছে। আকার ও জাতভেদে ক্যাকটাস তিনি ৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। আর ফার্ন ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা এবং স্টেফেনিয়া ১৫০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত দাম নেন।

ফরমান বলেন, ‘অফিস ও বাসার ইনডোর সাজাতে ক্যাকটাস, পাথোস, মানি প্ল্যান্ট, লিলি, অর্কিড বেশি নেন। আবার ফার্ন, নাইট কুইন, পদ্ম ও কিছু ক্যাকটাস আউটডোরে ব্যবহার করেন। মূলত শৌখিন মানুষই এগুলো সংগ্রহ করেন।’

ফরমানের এ উদ্যোগের সহযোগী ছিল তাঁর পরিবার। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাটার গাছ থেকেও যে ফুল ফোটে, আর সেই ফুল যে অন্য অনেক ফুলের চেয়ে সুন্দর—আমার বাগানে এলেই সেটা বোঝা যায়। মা-বাবা ও ভাইদের উৎসাহ না পেলে এটা সম্ভব হতো না।’

ফরমানের বাবা জাকের হোসাইন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ফরমানের গাছের প্রতি আগ্রহ ছিল। এখন বাগান করার পর পেকুয়ার বিভিন্ন মানুষ দেখতে আসে। এসব দেখলে অনেক ভালো লাগে।’

আগ্রহী তরুণ ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে ফরমান ক্যাকটাস ও ফার্ন উপহার দেন। এ ছাড়া বিভিন্ন বৃক্ষমেলায়ও তিনি এসব চারা বিক্রি করেন। অনলাইনের পাশাপাশি অনেকে সরাসরি তাঁর বাগানে এসে চারা কিনছেন।

পেকুয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কুতুবদিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অসীম কুমার দাশ বলেন, ‘ফরমান হাসনাতের উদ্যোগটি খুবই অনুপ্রেরণামূলক। এমন বাগান সবাই করতে পারেন না। তাঁকে উৎসাহ দিতে কৃষি বিভাগ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’