মা ও তিন বোন খুন, পরিবারে আর কেউ রইল না কিশোর সিফাতের

মা ও তিন বোনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই খবরে আহাজারি করছে কিশোর জুনায়েদ ইসলাম ওরফে সিফাত। গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায়ছবি: ভিডিও থেকে

‘আমার মা কই... আমার মারে আনি দাও, মারে ছাড়া আমি বাঁচমু না।’ কথাগুলো বলতে বলতে বুক চাপড়ে আহাজারি করছিল কিশোর জুনায়েদ ইসলাম ওরফে সিফাত (১৬)। কাঁদতে কাঁদতে কখনো মেঝেতে লুটিয়ে পড়ছে, কখনো জ্ঞান হারাচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটার দিকে এই দৃশ্য দেখা যায় লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরের ধানহাটা-সংলগ্ন এলাকার একটি ভাড়া বাসায়। গতকাল দুপুরে এলাকাটিতে ঘরে ঢুকে হত্যা করা হয় সিফাতের মা শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তিন বোন সাইমা আক্তার (২১), ইকরা বেগম (১৭) ও সিপা আক্তারকে (১০)। পরিবারটিতে কেবল সিফাত বেঁচে রয়েছে। ঘটনার পর থেকেই আহাজারি করে দিন কাটছে তার।

সিফাতের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বসবাস করে আসছে। তবে তাদের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলায়। স্থানীয় একটি রড–সিমেন্ট বিক্রির দোকানে চাকরি করে সিফাত। সরেজমিনে দেখা যায়, পাশের একটি বাসায় আহাজারি করছে সিফাত। স্বজনেরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

আরও পড়ুন

গতকাল রাত ১০টার দিকে কথা হয় সিফাতের সঙ্গে। আহাজারি করতে করতেই সিফাত জানায়, প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সে কর্মস্থলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়। সকাল ৯টার দিকেও তার সঙ্গে মুঠোফোনে মায়ের কথা হয়েছে। নাশতা করেছে কি না সেটি জানতে চেয়েছিলেন মা শাহিনুর বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সিফাত বলে, ‘মা শুধু জিজ্ঞেস করছিল নাশতা খাইছি কি না। আমি বলছি—খাইছি। এরপর আর কোনো কথা হয়নি।’

পরিবারটি খুবই অসচ্ছল। সিফাতের আয় এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় তাঁদের সংসার চলত। এমন একটি পরিবারের ওপর এত নির্মম হামলা সত্যিই মেনে নেওয়া কঠিন।
সাইফুল ইসলাম, স্থানীয় দোকানি

সিফাত যে দোকানটিতে চাকরি করেন সেটি সাইফুল ইসলামের। সাইফুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘হঠাৎ খবর পেয়ে আমরা দোকান থেকে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। ঘরের ভেতরে ঢুকে যে দৃশ্য দেখেছি, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মেঝেজুড়ে রক্ত। মা ও তিন মেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এমন ভয়াবহ দৃশ্য জীবনে কখনো দেখিনি।’ তিনি বলেন, ‘সিফাত আমার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। ছেলেটা খুবই ভদ্র ও পরিশ্রমী। সামান্য বেতনে চাকরি করে সে পরিবারের হাল ধরার চেষ্টা করছিল। সে এক দিনেই তার মা ও তিন বোনকে হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছে।’

সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘পরিবারটি খুবই অসচ্ছল। সিফাতের আয় এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় তাঁদের সংসার চলত। এমন একটি পরিবারের ওপর এত নির্মম হামলা সত্যিই মেনে নেওয়া কঠিন।’

মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে জখমের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড়। গতকাল দুপুরে তোলা
ছবি: প্রথম আলো

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাত বছর আগে সিফাতের বাবা কামাল হোসেন উপজেলার মোল্লারহাট এলাকায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। তিনি গ্রামে ঘুরে ঘুরে হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর শাহিনুর বেগম পরিবারের হাল ধরেন। তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে রায়পুর পৌর শহরের ধানহাটা এলাকার নদীর পারের বাসাটিতে থাকতেন তিনি। শাহিনুর বেগমের মেয়ে ইকরা বেগম একাদশ শ্রেণির ও সিপা বেগম চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে স্নাতকে ভর্তির অপেক্ষায় ছিল নিহত সাইমা আক্তার।

খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার (২৮) নামের এক যুবককে আটক করে গণপিটুনি দেয় স্থানীয় বাসিন্দারা। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে। এরপর চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা আড়াইটার দিকে হাসপাতালেই তাঁর মৃত্যু হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা জাকির হোসেন জানান, সিফাত দোকানে চাকরি করে প্রতি মাসে সাত হাজার টাকা করে পায়। সেই টাকা আর এলাকার মানুষের সহযোগিতায় পরিবারের খরচ চলত। তিনি বলেন, ‘অভাবের মধ্যেও শাহিনুর বেগম সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই পরিবারটিতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যাবে কারও কল্পনায় ছিল না। পুরো এলাকা শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে।’

পুলিশ জানায়, খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার (২৮) নামের এক যুবককে আটক করে গণপিটুনি দেয় স্থানীয় বাসিন্দারা। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে। এরপর চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা আড়াইটার দিকে হাসপাতালেই তাঁর মৃত্যু হয়। অন্তর মজুমদার নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার বাসিন্দা। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে তিনি ভাসমান ফল বিক্রেতা হিসেবে কাজ করতেন বলে স্থানীয় ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

পুলিশ জানায়, এ হত্যাকাণ্ড কী কারণে হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। হামলাকারীর সঙ্গে ওই পরিবারের পূর্ব কোনো পরিচয় ছিল না কি না, কী নিয়ে বিরোধ ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, ‘ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, স্বজন ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে, খুনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অর্থনৈতিক লেনদেন কিংবা অন্য কোনো বিরোধের বিষয় জড়িত থাকতে পারে। অভিযুক্ত যুবক মাদকাসক্ত ছিলেন বলেও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে কোনো কারণ বলা যাচ্ছে না।’

লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক বলেন, ‘অভিযুক্ত যুবক প্রায় তিন বছর আগে ওই ভবনের ওপরের তলায় ভাড়া থাকতেন। সেই সূত্রে ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তাঁর পূর্বপরিচয় ছিল। পূর্বপরিচিত হওয়ার কারণে তিনি ওই বাসায় যাতায়াত করতেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ঘটনার পেছনে সুনির্দিষ্ট কী কারণ রয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। বিষয়টির সব দিক গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’