সুন্দরবনে মৃত্যুফাঁদ, অভিযানে প্রাণ ফিরে পেল হরিণ

সুন্দরবনে মৃত্যুফাঁদ থেকে হরিণ উদ্ধার করে বনবিভাগের টহল দল। গতকাল শনিবারছবি: প্রথম আলো

সুন্দরবনের কয়রা নদী পেরিয়ে মহিশাল নদী ধরে কিছুক্ষণ এগোলেই ডান দিকে বনের গভীরে ঢুকে গেছে একটি সরু খাল, যার নাম ফুলতলার খাল। ডিঙিনৌকায় যতটা দূর যাওয়া সম্ভব, সেখানে যেতেই যাত্রা শেষ। এরপর শুরু হয় পায়ে হাঁটা টহল। চারপাশে উঁচু শ্বাসমূল, কাঁটাঝোপ, আর কাদায় ভরা বনপথে প্রতিটি পা ফেলা যেন সতর্কতার পরীক্ষা।

হঠাৎ সেই নিস্তব্ধ বন কেঁপে উঠল হরিণের ছটফটানি আর আর্তচিৎকারে। বনকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তাঁরা দেখেন, একটি মাদি হরিণের এক পা শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে গেছে। দড়ির টানে তার শরীর উঁচু হয়ে ঝুলে ছিল। প্রাণ বাঁচাতে আপ্রাণ ছটফটানিতে বন যেন আরও ভয়ার্ত হয়ে ওঠে।

ফাঁদ কেটে মুক্ত করতেই হরিণটি দৌড়ে বনের গভীরে মিলিয়ে যায়। গতকাল শনিবার বিকেলে সুন্দরবনের হড্ডা বন টহল ফাঁড়ির আওতাধীন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

আজ রোববার সকালে সুন্দরবনের বানিয়াখালী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা মামুন মাতুব্বর জানান, খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষকের নেতৃত্বে বানিয়াখালী ফরেস্ট স্টেশন, হড্ডা টহল ফাঁড়ি ও নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশনের সমন্বয়ে বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে টহলের সময়ই ফাঁদে আটকে পড়া হরিণটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।

নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা মোবারক হোসেন বলেন, ‘সহকারী বন সংরক্ষকসহ আমরা ১২ জন তিন ঘণ্টা ধরে বনের ভেতর হেঁটে টহল দিয়েছি। উদ্দেশ্য ছিল, হরিণ শিকারের ফাঁদ খুঁজে বের করা। এই হাঁটা খুবই কষ্টদায়ক—কারও পা কেটেছে, কারও হাত; কিন্তু থামার সুযোগ নেই।’

মোবারক হোসেন আরও বলেন, ফুলতলা খালের আশপাশে টহল চালিয়ে তাঁরা প্রায় ৬০টি ফাঁদ উদ্ধার করেছেন। এর সঙ্গে কিছু মালা ফাঁদও ছিল। তবে শিকারিদের কাউকেই পাওয়া যায়নি।

টহলে অংশ নেওয়া বনকর্মী মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘এই ফাঁদগুলোর কথা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। সামান্য অসতর্ক হলেই যে কেউ উল্টো ঝুলতে পারে। কিছুদিন আগে এমন ফাঁদেই বাঘ আটকে পড়েছিল। যে হরিণটি আমরা উদ্ধার করেছি, ওটা ছিল মাদি হরিণ। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বড় মায়া লাগছিল।’

ফুলতলা খালসংলগ্ন এলাকাটি কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের হড্ডা গ্রামের সন্নিকটে। স্থানীয় লোকজন জানান, লোকালয়ের পাশ দিয়েই গহিন জঙ্গল শুরু। শিকারিরা জালের সঙ্গে দড়ি নিয়ে জেলের ছদ্মবেশে বনে ঢোকেন। সেখানেই ফাঁদ তৈরি করে প্রাণী আটকা পড়লে মাংস কেটে লোকালয়ে এনে বিক্রি করা হয়।

খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘মৃত হরিণের মাংস উদ্ধার কোনো কৃতিত্ব নয়। শিকার হওয়ার আগেই হরিণকে রক্ষা করতে পারাটাই আমাদের সফলতা। সেই লক্ষ্যেই আমরা নিয়মিত হেঁটে টহল দিচ্ছি। শিকারি, মাংসের ক্রেতা ও বিক্রেতাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। শিকারিদের ধরতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল যে হরিণটি উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি পুরোপুরি সুস্থ ছিল—বনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’