৪৭ বছর পরও খুলনা-৬ আসন ফিরে পেল না বিএনপি

জামায়াতের মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ও বিএনপির প্রার্থী মনিরুল হাসানছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ ৪৭ বছর পর খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসন পুনরুদ্ধারের আশা জেগেছিল বিএনপির নেতা–কর্মীদের মধ্যে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনেকে বিশ্বাস করেছিলেন, এবার হয়তো আসনটি বিএনপি পাবে। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল সেই প্রত্যাশাকে অপূর্ণই রেখেছে। জয়ী হয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ।

কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দুবার আওয়ামী লীগ ও দুবার জামায়াত জয়লাভ করে। বিএনপি সর্বশেষ জয় পেয়েছিল ১৯৭৯ সালে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন পর্যন্ত আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। এবার দীর্ঘ সময় পর রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন আসায় বিএনপির নেতা–কর্মীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছিল।

তবে ত্রয়োদশ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ পেয়েছেন ১ লাখ ৫০ হাজার ৭২৪ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মনিরুল হাসান পেয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৭১০ ভোট। ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ১৪ ভোটে। পাইকগাছায় তুলনামূলক ভালো ফল করলেও কয়রায় বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ায় শেষ পর্যন্ত জয় হাতছাড়া হয় বিএনপির।

কয়রা উপজেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা সুজা উদ্দিন বলেন, ‘খুলনা-৬ আসন দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। জামায়াতের সঙ্গে জোটের সময়ও বিএনপি এখানে প্রার্থী দিত না। এই আসন থেকে আমাদের প্রার্থী দুবার নির্বাচিত হয়েছেন। সাংগঠনিকভাবে আমরা শক্ত অবস্থানে ছিলাম এবং মাঠপর্যায়ে মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এবারও আমরা জয়ী হব—এমন বিশ্বাস আমাদের ছিল।’

অন্যদিকে বিএনপির নেতারা বলছেন, দেরিতে প্রার্থী ঘোষণা ও তৃণমূল সংগঠনের দুর্বলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচনের মাত্র দুই মাস আগে রূপসা উপজেলার শ্রীফলতলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব মনিরুল হাসানকে প্রার্থী করা হয়। তাঁকে ‘বহিরাগত’ উল্লেখ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনাও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

কয়রা উপজেলা বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নুরুল আমিন বলেন, খুলনা-৬ আসনের দুটি উপজেলার মধ্যে পাইকগাছায় সাড়ে তিন হাজার ভোটে এগিয়ে থাকলেও কয়রায় বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়াই তাঁদের পরাজয়ের মূল কারণ। তাঁর অভিযোগ, মনোনয়নবঞ্চিত কয়েকজন নেতা প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করলেও ভেতরে ভেতরে নিষ্ক্রিয় ছিলেন।

নারী ভোটারদের প্রসঙ্গ তুলে নুরুল আমিন বলেন, কিছু কেন্দ্রে পুরুষদের তুলনায় নারী কেন্দ্রে বিএনপির ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে কম পড়েছে। তাঁর ভাষ্য, জামায়াত নারী ভোটারদের লক্ষ্য করে পরিকল্পিত প্রচারণা চালিয়েছে এবং বিভিন্ন কৌশলে তাঁদের নিজেদের পক্ষে টানতে সক্ষম হয়েছে। তবে শুরু থেকেই বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে ফল ভিন্ন হতে পারত।

বিএনপির অন্তত ১৫ জন স্থানীয় নেতা–কর্মী, সমর্থক ও ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় সমন্বয়ের অভাব, অভ্যন্তরীণ বিভাজন, অনেক কর্মীর নিষ্ক্রিয়তা এবং মাঠপর্যায়ের দুর্বল প্রচারণাই এ আসনে পরাজয়ের মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে ভোটারদের ঘরে ঘরে পৌঁছানো এবং নারী ভোটারদের কেন্দ্রে সক্রিয়ভাবে আনা সম্ভব হয়নি, যা দলের জন্য বড় ধরনের দুর্বলতা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

খুলনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মন্টু বলেন, ‘আমরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরাজয়ের কারণ নির্ধারণ করিনি। অনুমানভিত্তিক কথা বললে দলের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’

কয়রা সচেতন নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক মো. তরিকুল ইসলাম মনে করেন, জামায়াতের আগাম প্রস্তুতি, সাংগঠনিক ঐক্য ও নারী ভোটারদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। বিপরীতে বিএনপির দেরিতে প্রার্থী ঘোষণা, তৃণমূল সংগঠনের দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা জয় থেকে দলটিকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ভোটের ব্যবধান খুব বেশি না হলেও ৪৭ বছরের অপেক্ষা এবারও অপূর্ণই থেকে গেল বিএনপির।