পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় বৃদ্ধ ফজিলাতুন হাসিমুখে ইশারায় ডাকেন। কাছে গেলে শিশুদের মতো ভাঙা ভাঙা শব্দে খোঁজখবর জানতে চান। অনেকটা চিৎকার করেই ফজিলাতুনের সঙ্গে কথা বলতে হয়। কথায় কথায় আড্ডা জমে। তার আগেও ফজিলাতুনের সঙ্গে আড্ডা হয়েছে। তবে কোনো দিন নিজের জীবন নিয়ে বেশি কিছু বলতে রাজি হননি। তবে কার্তিকের সেই দুপুরে কী মনে করে সবই বললেন।

ফজিলাতুনের জন্ম চাঁদপুরের মতলবে। বুঝতে শেখার আগেই মা হারিয়েছেন। প্রতিবন্ধী বাবা বিদেশি জাহাজে রান্নার কাজ করতেন। সেখানেই থাকতেন। মা–বাবার আদর ছাড়া বড় হওয়া ফজিলাতুন নারায়ণগঞ্জে আসেন মুক্তিযুদ্ধের আগে। স্বামীর সঙ্গে। তিন বছরের সংসারে ফজিলাতুন মা হয়েছিলেন। মেয়ের নাম রেখেছিলেন হাজেরা। মাত্র দেড় বছর বয়সে হাজেরার মৃত্যু হয়। মেয়ের মৃত্যুর পর ফজিলাতুনের স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। তখন থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরে একা বেঁচে আছেন। ফজিলাতুন বলেন, আত্মীয় বলতে পৃথিবীতে তাঁর কেউ নেই।

এত কাজ থাকতে ব্যস্ত সড়কে ফল বিক্রি কেন—জানতে চাইলে ফজিলাতুন বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের পর বহু বছর মাইনষের বাড়ি কাম করছি। অসুখ অইলেও কামে যাইতে অইত। গালিগালাজ, মাইরধর করত। সহ্য করতে না পাইরা একদিন নিজেই ব্যবসা দিলাম। ব্যবসার মতো কোনো জিনিসে দাম নাই। এখন শান্তিতে আছি।’ এরপর যোগ করলেন, অন্তত ৩৫ বছর ধরে একই জায়গায় ফল বিক্রি করছেন তিনি। প্রতিদিন ৩০০–৪০০ টাকার মৌসুমি ফল নিয়ে বসেন। ১০০–২০০ টাকা আয় হয়। এতে জীবন চলে। ফজিলাতুন বলেন, ‘৭০০ টেহা বাড়ি ভাড়া, এক হাজার টেহা খানা খরচ।’ এক হাজার টাকায় কীভাবে খাবার হয়, জানতে চাইলে বলেন, ‘একবেলা খাই।’

ফজিলাতুনের সঙ্গে কথা বলার সময় বেশ কয়েকজন কথা শুনতে পাশে এসে দাঁড়ান। তাঁদের একজন জানতে চান, মাসের খরচ বাবদ যা প্রয়োজন, সেই অর্থের ব্যবস্থা করা হলে তিনি নেবেন কি না। ফজিলাতুন হাসিমুখে জবাব দেন, ‘ব্যবসার দাম আছে। হাত পাতার দাম নাই। আল্লাহ যেইভাবে রাখছে হেইভাবে আমি লাখপতি। হাসপাতালে গেসিলাম ঔষধ আনতে। গিয়া দেহি ডাক্তরও আমারে চিনে। লোকজনরে ডাইকা কইল, আমি এই বয়সেও হাত না পাইত্তা কাম কইরা খাই, এইডা দেইখা উনি সাহস পান।’

ফজিলাতুনের বয়স্ক ভাতার বই আছে। তবে তিনি ভাতা তুলতে পারছেন না। কারণ হিসেবে বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভাতা দেওয়া হয়। তাঁর মুঠোফোন নেই। তা ছাড়া তিনি মুঠোফোন চালাতে পারেন না।

ফজিলাতুন থাকেন শহরের পাক্কা রোড মনসুর হাজির বাড়িতে। মঙ্গলবার এলাকায় গিয়ে মুঠোফোনে ফজিলাতুনের ছবি দেখাতেই ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাঁকে চিনতে পারল। ছেলে–মেয়েরা দল বেঁধে বাড়ি নিয়ে যায়। অন্ধকার গলির শেষ মাথায় ছোট্ট একটি টিনশেডে ফজিলাতুনকে পাওয়া যায়। ঘরে আসবাব বলতে একটি কাঠের তক্তা। পুরোনো ছোট্ট পাতিল। টানানো রশিতে কাপড় ঝোলানো। ফজিলাতুনের ৭০০ টাকা ভাড়ার সেই খুপরিতে বসে আবারও আড্ডা জমে।

আড্ডার ফাঁকে ফজিলাতুনের কাছে জানতে চাই, একা জীবন কাটাতে গিয়ে কখনো কষ্ট লেগেছে কি না। জবাব দিলেন, ‘না। একলা আইছি, একলা যামু। এই মুসাফিরখানায় মাঝখানের সব মায়া। মায়ায় জড়াইলেই অশান্তি।’ জীবনে কী চাওয়ার আছে—জানতে চাইলে বলেন, ‘কোনো আশা নাই। শান্তিতে আছি। এমনিই মরতে চাই।’ বিদায়বেলায় এগিয়ে দেওয়ার সময় বললেন, ‘একটা চাওয়া আছে, ওই পারে গেলে যেন হাজেরারে আবার পাই...।’