তবে পুলিশের এই ব্যাখ্যা মানতে রাজি নন মামলার বাদী নিহত স্কুলশিক্ষক জিয়াউর রহমানের বড় ভাই আতিকুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশের এই বিড়াল ব্যাখ্যার কোনো ভিত্তি নেই। আমরা তাদের যুক্তি কোনোভাবেই মানতে পারছি না। পুলিশ তাদের তদন্ত সঠিকভাবে করতে না পারায় এমন ব্যখ্যা দিচ্ছে।’

গত ১৮ আগস্ট ভোরে গাজীপুর নগরের খাইলকুর এলাকায় প্রাইভেট কার থেকে শিক্ষক দম্পতি এ কে এম জিয়াউর রহমান (৫১) ও মাহমুদা আক্তারের (৩৫) লাশ উদ্ধার করা হয়। তাঁদের মুখ দিয়ে সামান্য লালা বের হওয়া ছাড়া কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। ঘটনাটি থানা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, পিবিআই, সিআইডি, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী  বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা তদন্ত করে আসছেন। কিন্তু তাঁরা কোনো সূত্র খুঁজে পাননি। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নিহত ব্যক্তিদের ভিসেরা ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনও পাওয়া যায়নি।

জিয়াউর রহমান টঙ্গীর শহীদ স্মৃতি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন টঙ্গীর আমজাদ আলী সরকার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। বিদ্যালয় দুটি পাশাপাশি। ওই দম্পতি গাজীপুরের কামারজুরী এলাকার বাসিন্দা। একই প্রাইভেট কারে তাঁরা গত ১৭ আগস্ট সকালে কর্মস্থলে যান। সন্ধ্যায় বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়ে নিখোঁজ হন। পরদিন ভোরে কার থেকে তাঁদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
১৯ আগস্ট নিহত ব্যক্তির বড় ভাই আতিকুর রহমান বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে গাছা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। তবে মামলার আড়াই মাস পেরিয়ে গেলেও তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি দুই লাশের ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়নি।

গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান শাফি মোহাইমেন বলেন, এখন পর্যন্ত নিহত ব্যক্তিদের ভিসেরা প্রতিবেদন আসেনি। যার কারণে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনও দেওয়া হয়নি। প্রতিবেদন কবে আসবে সেটিও সঠিক করে বলা যাচ্ছে না। তবে এসব পরীক্ষার জন্য সর্বোচ্চ তিন মাস সময় লাগে।

গাছা থানা পুলিশ জানায়, থানা–পুলিশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও আলামত সংগ্রহ করেছেন। বিভিন্ন স্থান থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু কোথাও কোনো ধরনের সূত্র পাওয়া যায়নি। ওই দম্পতি হত্যার শিকার হয়েছেন, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এর মধ্যে গাছা থানায় ইব্রাহীম হোসেন নামের নতুন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) যোগ দিয়েছেন। একসময় সিআইডিতে কর্মরত ছিলেন তিনি। সেখানকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এই মামলার কাজে তা লাগানোর চেষ্টা করছেন। এর অংশ হিসেবে মামলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে কিছু দিন আগে গাড়িতে একটি বিড়াল রেখে পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায় বিড়ালটি মারা গেছে।

এ ছাড়া পুলিশ গাড়ির ভেতরে থাকা বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করে সেসব পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), বিআরটিএ, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সসহ কয়েকটি সংস্থায় পাঠিয়েছে। ওসি ইব্রাহীম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিড়াল দিয়ে পরীক্ষার বিষয়টির বিস্তারিত এখনই প্রকাশ করতে চাচ্ছি না। আরও পরীক্ষা–নিরীক্ষার ফল পাওয়া গেলে নিশ্চিত হয়ে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাব।’

গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘গাড়িতে বিড়াল রেখে পরীক্ষার পর প্রাথমিকভাবে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, তাঁদের মৃত্যু এসির বিষাক্ত গ্যাস থেকেই হয়েছে। বিড়াল দিয়ে পরীক্ষার পর গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও এসির গ্যাস পরীক্ষার জন্য বিআরটি ও সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। সেই প্রতিবেদন এলে আমরা আরও নিশ্চিত হতে পারব।’