‘ধান গাছ সব পুইড়া যাইতাছে, দুঃখে বুকটা ফাইট্টা যাইতাছে’

ডিজেলের জন্য ফিলিং স্টেশনে কৃষকদের অপেক্ষা। শুক্রবার দুপুরে শ্রীনগরেছবি: দীপু মালাকার

মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ডিজেল না পাওয়ায় বোরোসহ বিভিন্ন আবাদি জমির সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ডিজেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকেরা।
উপজেলার হরপার ফিলিং স্টেশনে শুক্রবার সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা ডিজেলের জন্য ড্রাম নিয়ে ভিড় জমান। দুপুর পর্যন্ত শতাধিক কৃষককে ডিজেলের জন্য এ পাম্পে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।

বেলা দুইটার দিকে হরপার পাম্পে তেল পাওয়ার আশায় দীর্ঘ লাইনে ছিলেন উপজেলার পাচলদিয়া এলাকার কৃষক নান্নু মিয়া। তিনি এবার দুই কানি (প্রায় ৭০ শতাংশ) জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। ডিজেল সংকটে জমিতে তিনি সেচ দিতে পারছেন না। নান্নু মিয়া বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত তেলের জন্য পাম্পে লাইনে ছিলাম। অপেক্ষা করেও তেল পাইনি। শুক্রবার সকাল থেকে আবারও তেলের জন্য লাইন ধরছি। জমির ধান গাছ সব পুইড়া যাইতাছে। দুঃখে বুকটা ফাইট্টা যাইতাছে।’

পাম্পে ডিজেল নিতে অপেক্ষা করতে দেখা যায় ৭৫ বছর বয়সী কৃষক আলী আজগরকে। তিনি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাইনে থেকে ৪০০ টাকার তেল পান। আলী আজগর বলেন, ‘দুই দিন আসলে এক দিন তেল পাই। খাইয়া না খাইয়া লাইনে বইসা থাকতে হয়। যতটুক তেল পাওয়া যায়, তা দিয়া এক দিনও ঠিকমতো সেচ চলে না। প্রতিদিন তেল আনতে পাম্পে গেলে জমিতে কাজ বন্ধ থাকে। এমনে চলতে থাকলে এবার সিজনে উৎপাদন নষ্ট হইব।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় ২৪ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ ধান চাষ হয় শ্রীনগরে ও সিরাজদিখান উপজেলায়। বছরের এ সময় কৃষকদের জমিতে সেচ দেওয়া, উৎপাদিত ধান কাটা ও ফসল পরিবহনের জন্য ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হয়।

ফিলিং স্টেশন–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল সরবরাহ না পাওয়ায় তাঁরা সীমিত পরিমাণে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিদিন যে পরিমাণ জ্বালানি জেল আসছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুব সীমিত। আসার সঙ্গে সঙ্গে তা শেষ হয়ে যাচ্ছে।
হরপাড়া ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বছরের এ সময় আমাদের প্রতিদিন ১৬-২০ হাজার লিটার ডিজেলের দরকার হয়। সেখানে দুই–তিন দিন পর মাত্র সাড়ে ৪ হাজার লিটার ডিজেল আমরা বরাদ্দ পাচ্ছি, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুব নগণ্য। এতে করে কৃষকেরা চাহিদা অনুসারে তেল পাচ্ছেন না।’

আনোয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, তেলের সংকট কাজে লাগিয়ে অনেকে কৃষক সেজে পাম্প থেকে কম দামে তেল সংগ্রহ করে বাইরে বেশি দামে বিক্রি করছেন। এতে করে প্রকৃত কৃষকেরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

শুধু শ্রীনগর নয়; খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি তেলের এমন সংকট মুন্সিগঞ্জের অন্য উপজেলাগুলোতেও। তবে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বোরো ধান চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত সিরাজদিখান, টঙ্গিবাড়ী ও সদর উপজেলার কৃষকেরা। তাঁরা বলছেন, ডিজেলের এমন সংকট দ্রুত নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চলতি মৌসুমে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সদরে যোগনীঘাট এলাকার কৃষক শাহজালাল জানান, জমি থেকে আলু তোলার পর প্রতিবছর তাঁদের জমিতে বোরো ধান চাষ করতেন। এবার তেলসংকটের কারণে সে জমিতে সময়মতো সেচ দিতে পারেননি। তাই জমিতে এখন পর্যন্ত বোরো ধানের আবাদ করতে পারেননি। আলুর জমিগুলো অনাবাদি রয়েছে। বৃষ্টি আসলে ধান বাদে অন্য কোনো ফসল উৎপাদনের অপেক্ষায় আছেন তিনি। যেসব জমিতে অন্য সবজির আবাদ করা হয়েছিল পানি সেচের অভাবে সেগুলো নষ্ট হচ্ছে বলে জানান এই কৃষক।

তবে মুন্সিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, মুন্সিগঞ্জের কৃষকদের ডিজেল নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তিনি বলেন, ‘আমাদের কৃষকদের যে পরিমাণ তেলের চাহিদা রয়েছে, আমাদের তা মজুত আছে। প্রত্যেক কৃষক তাদের প্রয়োজনমাফিক তেল পাবে। কোনো কৃষক যদি তেল না পায়, তারা যদি আমাদেরকে এবং জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনকে জানায়, তাহলে আমরা সে বিষয়টি দেখব। সেই সঙ্গে কোনো ফিলিং স্টেশন যদি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি চেষ্টা করে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেকোনো মূল্যে উৎপাদনব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখা হবে।’